ইউরোর আন্তর্জাতিক অবস্থান সুসংহত করতে ইসিবি-র বড় পদক্ষেপ: স্থায়ী ও বৈশ্বিক হচ্ছে ইউরেপ (EUREP) ব্যবস্থা
সম্পাদনা করেছেন: Tatyana Hurynovich
ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক (ইসিবি) তাদের ‘ইউরোসিস্টেম রেপো ফ্যাসিলিটি ফর সেন্ট্রাল ব্যাংকস’ বা ইউরেপ (EUREP) ব্যবস্থাকে বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত এবং স্থায়ী করার এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। তারল্য সরবরাহের নীতিতে এটি একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ২০২৬ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি, শনিবার মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনে ইসিবি প্রেসিডেন্ট ক্রিস্টিন লাগার্দ এই ঘোষণা দেন। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে আগেকার সীমিত পরিসরের একটি আর্থিক সরঞ্জামকে এখন একটি স্থায়ী বৈশ্বিক তারল্য রিজার্ভে রূপান্তরিত করা হচ্ছে। বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং মার্কিন অর্থনৈতিক নীতির অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে ইউরোর আন্তর্জাতিক অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।
২০২০ সালের জুন মাসে কোভিড-১৯ মহামারীর সংকট মোকাবিলায় প্রথম ইউরেপ ব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল। শুরুতে এটি কেবল ইউরোজোনের সীমান্তবর্তী আটটি দেশের জন্য সীমাবদ্ধ ছিল। তবে ২০২৬ সালের তৃতীয় প্রান্তিক থেকে এই সুবিধা বিশ্বের সকল দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে। তবে মানি লন্ডারিং, সন্ত্রাসবাদে অর্থায়ন বা আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা দেশগুলো এই সুবিধার বাইরে থাকবে। ইসিবির প্রাথমিক লক্ষ্য ইউরোজোনের মূল্য স্থিতিশীলতা বজায় রাখা হলেও, এখন থেকে তারা সংকটের সময়ে অন্যান্য কেন্দ্রীয় ব্যাংককে উচ্চমানের জামানতের বিপরীতে ইউরো ঋণ দেওয়ার মাধ্যমে ‘লেন্ডার অব লাস্ট রিসোর্ট’ হিসেবে কাজ করবে। এর ফলে বাজার চাপের মুখেও ইউরোর তারল্য নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
নতুন এই কাঠামোর অধীনে প্রতিটি দেশের জন্য নীতিগতভাবে সর্বোচ্চ ৫০ বিলিয়ন ইউরো পর্যন্ত ঋণের সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। এই পদক্ষেপটি মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভের ‘ফিমা’ (FIMA) রেপো সুবিধার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ইসিবি-র বোর্ড সদস্য মার্টিন কোখার উল্লেখ করেছেন যে, বিশ্ববাজারে ডলারের আধিপত্য হ্রাসের সাথে সাথে ইউরোর ভূমিকা বৃদ্ধির জন্য ইউরোপকে প্রস্তুত হতে হবে এবং এর জন্য আর্থিক কাঠামোর আধুনিকায়ন প্রয়োজন। প্রেসিডেন্ট লাগার্দ জোর দিয়ে বলেন যে, এই ব্যবস্থাটি ইউরো বন্ডের আকস্মিক বা ‘ফায়ার সেল’ রোধ করবে, যা মুদ্রানীতি সঞ্চালনে বাধা সৃষ্টি করতে পারতো। এর ফলে বিনিয়োগ, ঋণ গ্রহণ এবং বাণিজ্যের মাধ্যম হিসেবে ইউরোর ওপর বিশ্বস্ততা আরও বৃদ্ধি পাবে।
ইসিবির এই কৌশলগত পরিবর্তনকে মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের সাথে বিশ্বমঞ্চে প্রতিযোগিতার একটি অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এটি ইউরোপের বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক মিত্রদের আকৃষ্ট করার একটি বৃহত্তর কৌশলের অংশ। লাগার্দ ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, ইউরোর আন্তর্জাতিক মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য একটি শক্তিশালী ভূ-রাজনৈতিক ভিত্তি এবং গভীর অর্থনৈতিক সংহতি প্রয়োজন। ২০২৪ সালে সুদের হার কমানো সত্ত্বেও ইউরোর আন্তর্জাতিক অবস্থান স্থিতিশীল ছিল। বর্তমান এই ইউরেপ সম্প্রসারণকে একটি প্রো-অ্যাক্টিভ বা আগাম পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে, যা ইউরোর বর্তমান ‘বৈশ্বিক মুহূর্ত’ বা গ্লোবাল মোমেন্টকে কাজে লাগাতে সাহায্য করবে।
কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রেও ইসিবি কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছে। এখন থেকে তারা প্রতিটি দেশের আলাদা আলাদা তারল্য ব্যবহারের তথ্য প্রকাশ করবে না, বরং শুধুমাত্র সাপ্তাহিক সামগ্রিক ঋণের তথ্য প্রদান করবে। এই সিদ্ধান্তটি অংশগ্রহণকারী কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর কাছে এই ব্যবস্থাকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলবে, কারণ এটি তাদের তারল্য চাহিদার ক্ষেত্রে অধিকতর গোপনীয়তা নিশ্চিত করবে। সামগ্রিকভাবে, ইউরেপ-এর এই সম্প্রসারণ একটি আর্থিক ও ভূ-রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে কাজ করবে, যা খণ্ডিত বিশ্বব্যবস্থায় ইউরোপীয় একক মুদ্রার স্থিতিস্থাপকতা এবং আকর্ষণ বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে। এর মাধ্যমে ইউরো বিশ্ব অর্থনীতিতে আরও নির্ভরযোগ্য এবং শক্তিশালী অবস্থানে অধিষ্ঠিত হবে।
6 দৃশ্য
উৎসসমূহ
Reuters
Reuters
Devdiscourse
European Union
investingLive
Stock Market - MarketScreener
WKZO
ECB
Investing.com
Investing.com
1470 & 100.3 WMBD
The Trail
এই বিষয়ে আরও খবর পড়ুন:
আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।
