প্রদাহ নিয়ন্ত্রণ এবং শ্বাসযন্ত্রের সুরক্ষায় প্রোপোলিসের ভূমিকা: বৈজ্ঞানিক প্রমাণের নতুন দিগন্ত

সম্পাদনা করেছেন: Maria Sagir

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণের প্রকোপ বাড়ার সাথে সাথে 'প্রোপোলিস' বা 'মৌমাছির আঠা' নিয়ে নতুন করে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। বর্তমান সময়ে কার্যকর এবং প্রমাণিত পুষ্টিগুণের সন্ধানে থাকা মানুষের মধ্যে এই প্রাকৃতিক উপাদানটির চাহিদা ক্রমাগত বাড়ছে। প্রোপোলিস হলো একটি আঠালো রজনজাতীয় পদার্থ, যা মৌমাছিরা উদ্ভিদের নির্যাস, মোম এবং তাদের নিজস্ব এনজাইমের সংমিশ্রণে তৈরি করে। মৌমাছিরা মূলত তাদের মৌচাককে জীবাণুমুক্ত রাখতে এবং বাইরের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে রক্ষা করতে এই উপাদানটি ব্যবহার করে। আধুনিক গবেষণায় এই প্রাকৃতিক পদার্থের শক্তিশালী অ্যান্টিবায়োটিক গুণাগুণ এবং বিভিন্ন ক্ষতিকর অণুজীবের বিরুদ্ধে এর কার্যকর লড়াই করার সক্ষমতা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে।

২০২৪ সালের আগস্ট মাসে Journal of Health, Population and Nutrition (BMC)-এ প্রকাশিত একটি পদ্ধতিগত পর্যালোচনা এবং মেটা-অ্যানালাইসিস থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক তথ্য পাওয়া গেছে। ইরানের নেশাবুর ইউনিভার্সিটি অফ মেডিকেল সায়েন্সেসের গবেষক আলী গোলামী এবং তার সহকর্মীদের গবেষণায় দেখা গেছে যে, মানসম্মত প্রোপোলিস গ্রহণ করলে শরীরের প্রদাহ সৃষ্টিকারী সাইটোকাইন যেমন ইন্টারলেউকিন-৬ (IL-6), সি-রিঅ্যাক্টিভ প্রোটিন (CRP) এবং টিউমার নেক্রোসিস ফ্যাক্টর-আলফা (TNF-α) এর মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়। ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের তথ্য অনুযায়ী, নিয়মিত প্রোপোলিস সেবনে ঋতু পরিবর্তনের সময় সর্দি-কাশির মতো শ্বাসযন্ত্রের উপরিভাগের সংক্রমণের ঝুঁকি প্রায় ৩১ শতাংশ কমে যায়। এছাড়া, প্রোপোলিস সমৃদ্ধ স্প্রে ব্যবহারের ফলে গলার ব্যথা প্লাসিবোর তুলনায় অন্তত দুই দিন দ্রুত সেরে যায় বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।

প্রোপোলিসের এই বহুমুখী ব্যবহার আধুনিক বিজ্ঞানের দান হলেও এর ইতিহাস প্রাচীন গ্রিস এবং পারস্য পর্যন্ত বিস্তৃত। সেই সময়ে এটি মূলত ক্ষত নিরাময় এবং হারপিসের মতো চর্মরোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হতো। বিজ্ঞানীরা বর্তমানে নিশ্চিত করেছেন যে, প্রোপোলিসে থাকা উচ্চমাত্রার ফ্ল্যাভোনয়েড এবং পলিফেনল শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে, যা শরীরের ক্ষতিকারক ফ্রি র‍্যাডিক্যাল দূর করতে সাহায্য করে। বিশেষ করে, এটি শরীরের NF-κB সিগন্যালিং পাথওয়েকে নিয়ন্ত্রণ করে, যা প্রদাহজনিত সমস্যার মূলে কাজ করে। এই প্রাকৃতিক উপাদানে ২০০টিরও বেশি জৈব যৌগ রয়েছে, যার মধ্যে ফেনোলিক অ্যাসিড, এসেনশিয়াল অয়েল এবং ভিটামিন এ, সি, ই ও বি-কমপ্লেক্সের উপস্থিতি একে একটি অনন্য ইমিউনোমডুলেটরি উপাদানে পরিণত করেছে।

তবে প্রোপোলিসের কার্যকারিতা সব সময় একই রকম হয় না, যা গবেষকদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এর গুণাগুণ মূলত কোন উদ্ভিদ থেকে নির্যাস সংগ্রহ করা হয়েছে, কোন ঋতুতে এটি তৈরি হয়েছে এবং ভৌগোলিক অবস্থানের ওপর সরাসরি নির্ভর করে। এই ভিন্নতার কারণে প্রোপোলিসের রাসায়নিক গঠনে পরিবর্তন আসতে পারে। বর্তমানে বাজারে এটি অ্যালকোহল টিংচার, জলীয় নির্যাস, ট্যাবলেট এবং ক্যাপসুলসহ বিভিন্ন আকারে পাওয়া যায়। তবে গবেষকরা সতর্ক করেছেন যে, প্রোপোলিস ব্যবহারে অ্যালার্জির ঝুঁকি থাকতে পারে। বিশেষ করে যারা দীর্ঘস্থায়ী স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছেন, তাদের নিয়মিত এটি গ্রহণ শুরু করার আগে অবশ্যই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

সামগ্রিকভাবে, বৈজ্ঞানিক মহলে প্রোপোলিস এখন আর কেবল একটি লোকজ বা ঘরোয়া চিকিৎসা নয়, বরং এটি একটি ক্লিনিক্যালি প্রমাণিত ফাংশনাল প্রোডাক্ট হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে। কার্ডিওমেটাবলিক স্বাস্থ্য এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে এর ইতিবাচক প্রভাব এখন বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত। তবে এর পূর্ণাঙ্গ এবং সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা নির্দেশিকা তৈরির জন্য বিজ্ঞানীরা আরও বড় পরিসরে এবং দীর্ঘমেয়াদী গবেষণার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছেন। এই প্রাকৃতিক উপাদানটি ভবিষ্যতে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে এবং শ্বাসযন্ত্রের সুরক্ষায় আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

9 দৃশ্য

উৎসসমূহ

  • terazgotuje.pl

  • Life Extension

  • Cleveland Clinic

আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।