সহনশীলতার প্রশিক্ষক হিসেবে মস্তিষ্ক: হাইপোথ্যালামাসের নিউরন শরীরকে চাপের সাথে মানিয়ে নিতে সাহায্য করে

সম্পাদনা করেছেন: Maria Sagir

২০২৬ সালের শুরুর দিকে বিজ্ঞান সাময়িকী 'নিউরন'-এ (Neuron) প্রকাশিত একটি যুগান্তকারী গবেষণা ব্যায়াম এবং শারীরিক কসরত সংক্রান্ত বিজ্ঞানের প্রচলিত ধারণাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করছে। পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রখ্যাত গবেষক জে. নিকোলাস বেটলি এবং তার সহযোগী গবেষক দল মস্তিষ্কের এমন একদল নিউরন শনাক্ত করেছেন, যাদের সক্রিয়তা শারীরিক সহনশীলতা বা স্ট্যামিনা তৈরির ক্ষেত্রে মূল চাবিকাঠি হিসেবে কাজ করে। এই গবেষণাটি মূলত সেই প্রাচীন ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে, যেখানে মনে করা হতো ব্যায়ামের সমস্ত সুফল কেবল শরীরের পেশি এবং বিপাকীয় পরিবর্তনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। বরং এটি প্রমাণ করে যে, শারীরিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে মস্তিষ্ক এক কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে।

এই গবেষণার জন্য বিজ্ঞানীরা জেনেটিক্যালি পরিবর্তিত ইঁদুরের ওপর পরীক্ষা চালান এবং তাদের নিয়মিত ট্রেডমিলে দৌড়ানোর প্রশিক্ষণ দেন। ইঁদুরগুলোর মস্তিষ্কের সূক্ষ্ম পরিবর্তনগুলো পর্যবেক্ষণ করতে তারা উন্নত শারীরবৃত্তীয় ইমেজিং এবং আণবিক বিশ্লেষণ পদ্ধতি ব্যবহার করেছিলেন। গবেষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি ছিল ভেন্ট্রোমিডিয়াল হাইপোথ্যালামাস (VMH) নামক মস্তিষ্কের একটি বিশেষ অঞ্চলে স্টেরয়েডোজেনিক ফ্যাক্টর-১ (SF-1) নিউরনের উপস্থিতি। মস্তিষ্কের এই অংশটি মূলত শরীরের শক্তির ভারসাম্য বা এনার্জি হোমিওস্ট্যাসিস নিয়ন্ত্রণ করে। দেখা গেছে যে, দৌড়ানোর সময় এই SF-1 নিউরনগুলো অত্যন্ত সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং ব্যায়াম শেষ হওয়ার পরও অন্তত এক ঘণ্টা পর্যন্ত সেই সক্রিয়তা বজায় থাকে।

টানা দুই সপ্তাহ ধরে প্রতিদিনের নিবিড় প্রশিক্ষণের পর দেখা যায় যে, ইঁদুরগুলোর সহনশীলতা বিস্ময়করভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। তারা আগের তুলনায় অনেক বেশি গতিতে এবং দীর্ঘ সময় ধরে দৌড়াতে সক্ষম হচ্ছিল। মজার ব্যাপার হলো, প্রশিক্ষণের দিন যত বাড়ছিল, সক্রিয় SF-1 নিউরনের সংখ্যা এবং তাদের কাজের মাত্রাও পাল্লা দিয়ে বাড়ছিল। এই নিউরনগুলোর প্রকৃত ভূমিকা যাচাই করতে বিজ্ঞানীরা কৃত্রিমভাবে সেগুলোকে নিষ্ক্রিয় এবং সক্রিয় করে পরীক্ষা করেন। যখন এই নিউরনগুলোর কার্যকলাপ বন্ধ করে দেওয়া হয়, তখন দেখা যায় যে ইঁদুরগুলো নিয়মিত ব্যায়াম করা সত্ত্বেও তাদের শারীরিক সহনশীলতায় কোনো উল্লেখযোগ্য উন্নতি ঘটেনি।

এর বিপরীতে, ব্যায়াম বা শারীরিক পরিশ্রমের পর যখন SF-1 নিউরনের সিগন্যালিং কৃত্রিমভাবে বাড়ানো হয়, তখন সহনশীলতা বৃদ্ধির হার আরও ত্বরান্বিত হয়। এই পর্যবেক্ষণ থেকে বিজ্ঞানীরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে, ব্যায়াম শেষ করার পরবর্তী সময়ে SF-1 নিউরনের সক্রিয়তাই মূলত শরীরের দীর্ঘমেয়াদী অভিযোজন প্রক্রিয়াকে সচল করে। বারবার ব্যায়াম করার ফলে এই নিউরনগুলো শরীরের গ্লুকোজ ব্যবহার এবং বিভিন্ন শক্তির উৎসের মধ্যে দ্রুত পরিবর্তন করার ক্ষমতাকে আরও নিখুঁতভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে শেখে। এর ফলে শরীর প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও দীর্ঘক্ষণ শক্তি ধরে রাখতে পারে।

গবেষক জে. নিকোলাস বেটলির মতে, SF-1 নিউরনগুলো নিউরাল সার্কিট সক্রিয় করতে এবং ব্যায়াম-পরবর্তী সময়ে মস্তিষ্ককে পুনর্গঠিত করতে অপরিহার্য ভূমিকা পালন করে। এই গবেষণাটি ব্যায়াম বিজ্ঞানে একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে, যা প্রমাণ করে যে মস্তিষ্ক কেবল শরীরের আজ্ঞাবহ নয়, বরং এটি সক্রিয়ভাবে শরীরকে প্রশিক্ষিত করার প্রক্রিয়ায় অংশ নেয়। এই গবেষণার ফলাফল ভবিষ্যতে পুনর্বাসন প্রক্রিয়ায় এবং যাদের স্বাভাবিক শারীরিক সহনশীলতা অত্যন্ত কম, তাদের চিকিৎসায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে পারে। এটি আমাদের শেখায় যে সুস্থ শরীরের জন্য কেবল পেশির কসরত নয়, মস্তিষ্কের সঠিক উদ্দীপনাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

22 দৃশ্য

উৎসসমূহ

  • RTP - Rádio Televisão Portuguesa

  • Neuroscience News

  • ScienceAlert

  • RTP

  • ScienceAlert

  • ScienceAlert

আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।