AAAS কনফারেন্সে নতুন তথ্য: মৃত্যুর পরেও কি চেতনা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে?

সম্পাদনা করেছেন: Maria Sagir

২০২৬ সালের ১২ থেকে ১৪ ফেব্রুয়ারি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনা অঙ্গরাজ্যের ফিনিক্সে অনুষ্ঠিত আমেরিকান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য অ্যাডভান্সমেন্ট অফ সায়েন্স (AAAS)-এর বার্ষিক সম্মেলনে মৃত্যুর পরবর্তী জৈবিক ও স্নায়বিক ক্রিয়াকলাপ নিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। গবেষণার এই নতুন তথ্যগুলো ইঙ্গিত দেয় যে, জীবনাবসানের প্রক্রিয়াটি কোনো আকস্মিক বা তাৎক্ষণিক ঘটনা নয়। প্রচলিত চিকিৎসা শাস্ত্রে মৃত্যুকে একটি নির্দিষ্ট মুহূর্ত হিসেবে দেখা হলেও, আধুনিক এই গবেষণাগুলো প্রমাণ করছে যে এটি আসলে একটি দীর্ঘস্থায়ী ও বহুধাপ বিশিষ্ট প্রক্রিয়া।

এই গবেষণার মূল ভিত্তি ছিল হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর বেঁচে ফেরা রোগীদের অভিজ্ঞতার বিশ্লেষণ। সংগৃহীত তথ্য অনুসারে, প্রায় ২০ শতাংশ রোগী জানিয়েছেন যে, যখন তাদের মস্তিষ্কের কর্টিকাল কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ ছিল বলে চিকিৎসকরা ধরে নিয়েছিলেন, তখনও তারা সচেতন ছিলেন। অ্যারিজোনা স্টেট ইউনিভার্সিটি (ASU)-এর শিক্ষার্থী আনা ফাউলার এই সম্মেলনে গবেষণার এই অংশটি উপস্থাপন করেন। রোগীদের এই অভিজ্ঞতার মধ্যে এমন কিছু বাস্তবসম্মত বর্ণনা পাওয়া গেছে যা বর্তমান চিকিৎসা বিজ্ঞানের প্রচলিত নিয়মাবলী বা প্রোটোকলগুলোকে নতুন করে সাজানোর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।

এই গবেষণার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ছিল এনওয়াইইউ ল্যাঙ্গোন-এর ক্রিটিক্যাল কেয়ার অ্যান্ড রিসাসিটেশন রিসার্চ বিভাগের পরিচালক ডক্টর স্যাম পার্নিয়ার নেতৃত্বে পরিচালিত 'অ্যাওয়ার টু' (AWARE II) নামক একটি গবেষণা প্রকল্প। যুক্তরাজ্য এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ২৫টিরও বেশি হাসপাতালে পরিচালিত এই প্রকল্পটি দেখিয়েছে যে, কার্ডিওপালমোনারি রিসাসিটেশন বা সিপিআর শুরু করার এক ঘণ্টা পর পর্যন্ত মস্তিষ্ক স্বাভাবিক বৈদ্যুতিক সংকেত পাঠাতে সক্ষম। এটি চিকিৎসা বিজ্ঞানের সেই পুরনো ধারণাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করে, যেখানে মনে করা হতো অক্সিজেনের অভাবে ৫ থেকে ১০ মিনিটের মধ্যেই মস্তিষ্কের কোষগুলো চিরতরে অকেজো হয়ে যায়।

ক্লিনিকাল মৃত্যুর অভিজ্ঞতা অর্জনকারী ব্যক্তিরা প্রায়ই শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার এক অদ্ভুত অনুভূতির কথা বর্ণনা করেছেন। তারা জানিয়েছেন যে, তারা কোনো ধরনের শারীরিক যন্ত্রণা বা মানসিক উদ্বেগ ছাড়াই তাদের পুনরুজ্জীবিত করার চিকিৎসা প্রক্রিয়াগুলো পর্যবেক্ষণ করতে পারছিলেন। এই ধরনের সাক্ষ্যগুলো চিকিৎসা বিজ্ঞানের নৈতিক দিকগুলোতে, বিশেষ করে অঙ্গ প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। যদি মৃত্যুর ঘোষণার পরও মস্তিষ্কের কার্যক্রম অব্যাহত থাকে, তবে তা অঙ্গ সংগ্রহের প্রক্রিয়ায় নতুন নৈতিক মানদণ্ড নির্ধারণের দাবি রাখে।

২০২৬ সালের এএএএস সম্মেলনের মূল প্রতিপাদ্য ছিল 'সায়েন্স অ্যাট স্কেল' বা 'বৃহৎ পরিসরে বিজ্ঞান'। এই আয়োজনে তাত্ত্বিক আবিষ্কারগুলোকে কীভাবে বাস্তব জীবনের জটিল সমস্যা সমাধানে প্রয়োগ করা যায়, তার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ডক্টর পার্নিয়া এবং আনা ফাউলারের এই সম্মিলিত গবেষণাগুলো মস্তিষ্ক সংরক্ষণের আধুনিক পদ্ধতি উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে এক নতুন পথ দেখিয়েছে। এই আবিষ্কারগুলো ভবিষ্যতে জীবন ও মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থাকা রোগীদের উন্নত চিকিৎসা সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে।

এই যুগান্তকারী গবেষণাটি কেবল মৃত্যুর সংজ্ঞা পরিবর্তন করছে না, বরং এটি মানব মস্তিষ্কের সহনশীলতা এবং চেতনার স্থায়িত্ব সম্পর্কে আমাদের ধারণাকে আরও গভীর করছে। ভবিষ্যতে এই তথ্যের ভিত্তিতে হয়তো এমন সব প্রযুক্তি তৈরি হবে যা মস্তিষ্কের কোষগুলোকে দীর্ঘক্ষণ সজীব রাখতে সক্ষম হবে। এর ফলে জীবন বাঁচানোর লড়াইয়ে চিকিৎসকরা আরও বেশি সময় পাবেন এবং অনেক ক্ষেত্রে মৃত্যুপথযাত্রী রোগীদের ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে। এই নতুন বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে।

9 দৃশ্য

উৎসসমূহ

  • Prve Crnogorske Nezavisne Elektronske Novine

  • Vijesti.ba

  • Tanjug

  • NIN.rs

  • Express.co.uk

  • LADbible

আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।