স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের হাত ধরে প্রতিষ্ঠিত স্টার্টআপ 'ক্লেয়ার হেলথ' (Clair Health) নারী স্বাস্থ্যের সুরক্ষায় এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। তারা 'ক্লেয়ার' (Clair) নামক একটি কবজিতে পরিধানযোগ্য ডিভাইস তৈরি করছে, যা শরীরের গুরুত্বপূর্ণ রিপ্রোডাক্টিভ হরমোন যেমন ইস্ট্রোজেন, প্রোজেস্টেরন, লুটিইনাইজিং হরমোন (LH) এবং ফলিকল-স্টিমুলেটিং হরমোন (FSH) এর মাত্রা নিরবচ্ছিন্নভাবে পর্যবেক্ষণ করতে সক্ষম। প্রচলিত রক্ত বা প্রস্রাব পরীক্ষার পরিবর্তে, এই ডিভাইসটি রিয়েল-টাইমে হরমোনের পরিবর্তনের তথ্য প্রদান করবে, যা নারী স্বাস্থ্যের দীর্ঘদিনের একটি অপূর্ণ চাহিদা পূরণ করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এই বিশেষ ব্রেসলেটটিতে ১০টি অত্যাধুনিক বায়োসেন্সর ব্যবহার করা হয়েছে। এই সেন্সরগুলো ত্বকের তাপমাত্রা, হৃদস্পন্দনের হার, হার্ট রেট ভ্যারিয়েবিলিটি (HRV), শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি, ইলেকট্রোডার্মাল কার্যকলাপ এবং ব্যবহারকারীর ঘুম ও দৈনন্দিন চলাফেরার তথ্য সংগ্রহ করে। ক্লেয়ার হেলথের পেটেন্ট করা মেশিন লার্নিং অ্যালগরিদমগুলো এই বহুমুখী ডেটা বিশ্লেষণ করে হরমোনের মাত্রা, বিশেষ করে প্রোজেস্টেরন মেটাবোলাইটের অবস্থা নির্ণয় করে। কোম্পানির সহ-প্রতিষ্ঠাতা এবং সিইও জেনি ডুয়ান (Jenny Duan) উল্লেখ করেছেন যে, ঐতিহাসিকভাবে নারীরা তাদের স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সিদ্ধান্তগুলো অনেকটা 'অন্ধভাবে' নিতেন, যা গ্লুকোজ পরিমাপ ছাড়াই ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের চেষ্টার মতো ছিল।
ক্লেয়ার হেলথ তাদের এই উদ্ভাবনকে কেবল একটি সাধারণ ট্র্যাকার হিসেবে নয়, বরং একটি মেডিকেল-গ্রেড ডিভাইস হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। এই লক্ষ্যেই তারা ভবিষ্যতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (FDA)-এর অনুমোদন লাভের পরিকল্পনা করছে। বাজারে থাকা সাধারণ ট্র্যাকারগুলো সাধারণত কেবল শরীরের তাপমাত্রা এবং ক্যালেন্ডার মডেলের ওপর ভিত্তি করে ঋতুচক্রের তথ্য দেয়। কিন্তু ক্লেয়ারের লক্ষ্য হলো হরমোনের পরিবর্তনের গভীর অন্তর্দৃষ্টি প্রদান করা, যা বিশেষ করে পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম (PCOS) এবং অনিয়মিত ঋতুচক্রের সমস্যায় ভোগা নারীদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্ট্যানফোর্ড মেডিসিনের ক্লিনিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর এবং রিপ্রোডাক্টিভ এন্ডোক্রিনোলজি বিশেষজ্ঞ বৃন্ধা বাভান (Brindha Bavan) এই প্রকল্পের সাথে যুক্ত হওয়া এর বৈজ্ঞানিক ভিত্তিটিকে আরও শক্তিশালী করেছে।
এই প্রযুক্তির নির্ভুলতা যাচাই করার জন্য স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি স্বতন্ত্র ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল বা ক্লিনিক্যাল স্টাডি পরিচালনার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এই গবেষণায় প্রায় ১০০ জন নারী কয়েক মাস ধরে অংশগ্রহণ করবেন, যেখানে ডিভাইসের মাধ্যমে প্রাপ্ত 'ভার্চুয়াল' হরমোন ডেটার সাথে ল্যাবরেটরি পরীক্ষার ফলাফলের তুলনা করা হবে। ডক্টর বাভানের মতে, নিরবচ্ছিন্ন পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে পিটুইটারি গ্রন্থি এবং ডিম্বাশয়ের পারস্পরিক ক্রিয়া আরও ভালোভাবে বোঝা সম্ভব হবে, যা প্রজনন ক্ষমতা, মানসিক স্বাস্থ্য এবং সামগ্রিক সুস্থতার জন্য অত্যন্ত জরুরি। এই প্রকল্পের বেটা টেস্টিং ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে শুরু হবে এবং ডিভাইসগুলোর সরবরাহ শুরু হবে একই বছরের নভেম্বরে।
ক্লেয়ার হেলথের এই প্রযুক্তিগত পদ্ধতি ব্যক্তিগত নারী স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে একটি বড় পরিবর্তন নির্দেশ করে। এখন থেকে হরমোনের তথ্য ব্যবহারকারীর কাছে হৃদস্পন্দন বা ঘুমের তথ্যের মতোই সহজলভ্য হবে। কোম্পানিটি ব্যবহারকারীর তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষায় স্থানীয়ভাবে ডেটা প্রসেসিং করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যা বর্তমান ডিজিটাল যুগে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রজনন স্বাস্থ্যের পাশাপাশি, এই ডিভাইসটি ক্রীড়া নৈপুণ্য বৃদ্ধি, শক্তির সঠিক ব্যবস্থাপনা এবং পেরিমেনোপজ বা মেনোপজের পূর্ববর্তী সময়ের শারীরিক পরিবর্তনগুলো মোকাবিলা করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।




