সেন্ট পিটার্সবার্গে বিড়ালদের সম্মানে নির্মিত স্মৃতিস্তম্ভ: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় শহর রক্ষাকারী চারপেয়ে বীরদের কাহিনী
সম্পাদনা করেছেন: Katerina S.
সেন্ট পিটার্সবার্গের কম্পোজিটরভ স্ট্রিটের একটি নিরিবিলি আঙিনায় একটি বিশেষ ব্রোঞ্জ ভাস্কর্য শোভা পাচ্ছে। এই স্মৃতিস্তম্ভটি সেইসব বিড়ালদের প্রতি উৎসর্গ করা হয়েছে যারা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় লেনিনগ্রাদ অবরোধের কঠিন দিনগুলোতে ইঁদুরের উপদ্রব থেকে শহরকে রক্ষা করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। ভাস্কর্যটিতে একটি বিড়ালকে একটি টুলের ওপর ল্যাম্পশেডের নিচে বসে থাকতে দেখা যায়, যা শহরের ইতিহাসে তাদের মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানের প্রতীক। স্মৃতিস্তম্ভের ভিত্তিটি একটি কাঠের মেঝে বা পারকেটের আদলে তৈরি, যা অবরোধের সেই ভয়াবহ শীতের দিনগুলোতে ঘর গরম রাখার জন্য জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হতো। এখানে একটি স্মারক ফলক রয়েছে যাতে লেখা আছে, "অবরুদ্ধ লেনিনগ্রাদের বিড়ালদের স্মরণে।" স্থানীয় বাসিন্দাদের উদ্যোগে ২০১৬ সালের ৪ সেপ্টেম্বর এটি স্থাপন করা হলেও আনুষ্ঠানিকভাবে ২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৬ তারিখে এর উদ্বোধন করা হয়।
১৯৪২ সাল ছিল লেনিনগ্রাদের ইতিহাসের অন্যতম অন্ধকার অধ্যায়। প্রতিদিন শত শত মানুষ অনাহারে মারা যাচ্ছিলেন, আর তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল ইঁদুরের এক ভয়াবহ আক্রমণ। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, ইঁদুরের দলগুলো রাস্তায় সুশৃঙ্খলভাবে চলাচল করত এবং কখনও কখনও তাদের সংখ্যা এত বেশি হতো যে ট্রাম চলাচল বন্ধ করে দিতে হতো। এই ক্ষতিকর প্রাণীরা কেবল শহরের সামান্য খাদ্য মজুতই শেষ করছিল না, বরং মহামারী ছড়ানোর চরম ঝুঁকিও তৈরি করেছিল। এই "পঞ্চম বাহিনী" বা ইঁদুর বাহিনীকে দমন করার সব ধরনের প্রচলিত প্রচেষ্টা তখন ব্যর্থ হয়েছিল।
চরম খাদ্য সংকটের সময়, বিড়ালরা যারা ছিল ইঁদুরের প্রাকৃতিক শত্রু, তাদের অনেককেই ক্ষুধার্ত শহরবাসী বেঁচে থাকার তাগিদে খেয়ে ফেলেছিলেন। সেই সময়ের ডায়েরিগুলোতে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিড়ালের মাংসই ছিল অনেকের জন্য জীবন বাঁচানোর একমাত্র উপায়। ফলস্বরূপ, যখন অবরোধ আংশিকভাবে তুলে নেওয়া হলো, তখন ইঁদুর দমনের জন্য বিড়ালের সংখ্যা বাড়ানো জরুরি হয়ে পড়ে। ১৯৪৩ সালের বসন্তে শহর কর্তৃপক্ষ বাইরে থেকে বিড়াল আনার সিদ্ধান্ত নেয়। "বিড়াল অভিযান"-এর অংশ হিসেবে ইয়ারোস্লাভল থেকে চারটি ওয়াগন ভর্তি বিড়াল আনা হয়, যাদের মধ্যে ধূসর রঙের বিড়ালগুলো ছিল সেরা ইঁদুর শিকারী। পরবর্তীতে সাইবেরিয়ার টিয়ুমেন, ওমস্ক এবং ইরকুটস্কের মতো অঞ্চলগুলো থেকে প্রায় ৫০০০ বিড়াল লেনিনগ্রাদে আনা হয়েছিল।
১৯৪৪ সালের জানুয়ারি মাসের দিকে পরিস্থিতি এমন ছিল যে, একটি বিড়ালছানার দাম উঠেছিল ৫০০ রুবেল, যেখানে কালোবাজারে রুটির দাম ছিল মাত্র ৫০ রুবেল। এই বিড়ালগুলো ছিল তখন শহরের জন্য অমূল্য সম্পদ। বাইরে থেকে আসা এই বিড়ালগুলো অত্যন্ত সফলভাবে শহরকে ইঁদুরের হাত থেকে মুক্ত করতে সক্ষম হয়েছিল। তাদের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলেই শহরের খাদ্য গুদামগুলো রক্ষা পায় এবং রোগের বিস্তার রোধ করা সম্ভব হয়।
এই সাহসী বিড়ালদের বংশধররা আজও রাষ্ট্রীয় হারমিটেজ মিউজিয়ামে (State Hermitage Museum) তাদের সেবা দিয়ে যাচ্ছে। হারমিটেজ বিড়ালদের ইতিহাস আঠারো শতক পর্যন্ত বিস্তৃত এবং বর্তমানে তারা এই জাদুঘরের আনুষ্ঠানিক কর্মী হিসেবে স্বীকৃত। বর্তমানে সেখানে প্রায় ৫০০-এর বেশি বিড়াল বসবাস করছে, যারা সেই সাইবেরীয় উদ্ধারকারী বিড়ালদের উত্তরসূরি। এই বিড়ালদের নিয়মিত খাবার এবং যত্নের জন্য বিশেষ বরাদ্দ বা "বেতন" প্রদান করা হয়, যা তাদের ঐতিহ্যের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের একটি অংশ।
প্রতি বছর ২৭ জানুয়ারি, যখন ১৯৪৪ সালে লেনিনগ্রাদ অবরোধ সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাহারের দিনটি স্মরণ করা হয়, তখন এই চারপেয়ে বীরদের প্রতিও শ্রদ্ধা জানানো হয়। বিভিন্ন স্মরণসভার মাধ্যমে শহরবাসী সেই কঠিন সময়ে বিড়ালদের অবদানের কথা কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করে। এই স্মৃতিস্তম্ভটি কেবল একটি ভাস্কর্য নয়, বরং এটি প্রতিকূল সময়ে মানুষ ও প্রাণীর পারস্পরিক সহমর্মিতা এবং সাহসিকতার এক চিরন্তন প্রতীক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।
11 দৃশ্য
উৎসসমূহ
Fishki.net - Сайт хорошего настроения
Памятник кошкам блокадного Ленинграда - Википедия
Лента новостей Красноярска
Аргументы и факты
Телеканал 78
Газета СПБ РУ - Gazeta.SPb
এই বিষয়ে আরও খবর পড়ুন:
আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।
