২০২৫ সালের ২২শে ডিসেম্বর, সোমবার, বিশ্বজুড়ে মূল্যবান ধাতুর বাজার নতুন শিখরে পৌঁছেছে। এর মূল কারণ হলো জটিল সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং চলমান ভূ-রাজনৈতিক টানাপোড়েন। নিউ ইয়র্কের সিওএমইএক্স (COMEX) এক্সচেঞ্জে স্পট গোল্ড প্রতি আউন্স ৪৪০০ মার্কিন ডলারের সীমা অতিক্রম করে সর্বোচ্চ ৪৪৩৬.৯ ডলারে পৌঁছে যায়। অন্যদিকে, রূপার বৃদ্ধি আরও নাটকীয় ছিল; এটি ট্রেডিংয়ের শীর্ষে প্রতি আউন্স ৬৮.৮৭ ডলারে পৌঁছে নিজস্ব সর্বকালের রেকর্ড তৈরি করে। এই যুগপৎ উত্থান বিনিয়োগকারীদের মনোভাবের একটি সুস্পষ্ট পরিবর্তনকে প্রতিফলিত করে, যেখানে ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মুখে তারা নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে রয়েছে।
মূল্যবান ধাতুগুলির এই ঊর্ধ্বগতি দুটি প্রধান কারণ দ্বারা চালিত হয়েছে। প্রথমত, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বৃদ্ধি এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কর্তৃক ভেনিজুয়েলার বিরুদ্ধে আরোপিত নতুন নিষেধাজ্ঞা, বিশেষত দেশটি থেকে বা দেশে প্রবেশকারী তেল ট্যাংকারগুলির উপর 'সম্পূর্ণ অবরোধ' ঘোষণার মতো পদক্ষেপগুলি ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। দ্বিতীয়ত, মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভ (ফেড)-এর ভবিষ্যৎ মুদ্রানীতি নিয়ে বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা তীব্র হচ্ছে। ট্রেডাররা এখন হিসেব কষছে যে ২০২৬ সালের মধ্যে ফেড কমপক্ষে দুবার মূল সুদের হার কমাতে পারে। এই প্রত্যাশা আরও জোরালো হয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক নভেম্বর মুদ্রাস্ফীতি রিপোর্টের ভিত্তিতে, যেখানে বার্ষিক মুদ্রাস্ফীতির হার ২.৭ শতাংশে নেমে আসার তথ্য প্রকাশিত হয়। এর আগে, গত ১০ই ডিসেম্বরে, ফেড ২০২৬ সালের জন্য PCE মুদ্রাস্ফীতির পূর্বাভাস ২.৬ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২.৪ শতাংশ করেছিল।
২০২৫ সালের পারফরম্যান্সের দিকে তাকালে দেখা যায় সোনা প্রায় ৭০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা ১৯৭৯ সালের পর সেরা ফলাফল হতে পারে। তবে, এই সময়ে রূপা সোনাকে অনেক পেছনে ফেলে দিয়েছে, একই সময়কালে প্রায় ১৩৮ শতাংশ বৃদ্ধি দেখিয়েছে। এই পার্থক্য ইঙ্গিত দেয় যে, ঐতিহ্যবাহী 'নিরাপদ আশ্রয়' চাহিদা ছাড়াও, রূপার বাজারে শিল্পখাতের চাহিদা, বিশেষত সৌর শক্তি এবং ইলেকট্রিক গাড়ির ক্ষেত্র থেকে আসা চাহিদা, এবং সম্ভবত সরবরাহ ঘাটতি একটি বড় ভূমিকা পালন করছে। এর আগে ১৯৮০ এবং ২০১১ সালে রূপার যে ঐতিহাসিক সর্বোচ্চ স্তর ছিল, তা ছিল প্রায় ৪৯ ডলার প্রতি আউন্স, যা চলতি বছরে বহুলাংশে অতিক্রম করা হয়েছে।
ফেডের ডিসেম্বরের বৈঠকে সুদের হার ২৫ বেসিস পয়েন্ট কমিয়ে ৩.৫০–৩.৭৫ শতাংশের পরিসরে আনা হয়েছিল। ফেড কর্মকর্তাদের মধ্যম পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ সুদের হার আরও কমে ৩.৪ শতাংশে নামতে পারে, যা ২৫ বেসিস পয়েন্টের একটি হ্রাসের সমান। যদিও বোর্ড গভর্নর ক্রিস্টোফার ওয়ালার আরও নীতি শিথিল করার 'সম্ভাবনা' থাকার কথা বলেছিলেন। এর বিপরীতে, রাশিয়ার ক্ষেত্রে চিত্রটি ভিন্ন। বিশ্লেষকদের এক জরিপ অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জন্য রাশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গড় মূল সুদের হার ১৪.১ শতাংশে উন্নীত হওয়ার প্রত্যাশা করা হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে, ২০২৫ সালে মার্কিন ডলারের বিপরীতে রাশিয়ান রুবলের মূল্য প্রায় ১০ শতাংশ কমেছে।
এই দিনে নিউ ইয়র্কের সিওএমইএক্স এবং সিঙ্গাপুরের মতো প্ল্যাটফর্মগুলিতে লেনদেন চলে। সিঙ্গাপুরে স্পট গোল্ডের দাম ছিল প্রতি আউন্স ৪৩৮৬.৩২ ডলার, যা ১.১ শতাংশ বৃদ্ধি নির্দেশ করে। স্পট মার্কেটে রূপা পূর্ববর্তী সেশনের তুলনায় ৩ শতাংশ বেড়ে ৬৭.৫৩২৫ ডলারে পৌঁছেছে। সুতরাং, ২০২৫ সালের একেবারে শেষে মূল্যবান ধাতুগুলির এই রেকর্ড মূল্যবৃদ্ধি মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মুদ্রানীতির ভিন্নতা এবং বিশ্বব্যাপী চলমান অস্থিরতার সরাসরি ফল, যা ঝুঁকি মোকাবিলার অপরিহার্য হাতিয়ার হিসেবে এদের অবস্থানকে আরও একবার সুপ্রতিষ্ঠিত করল।



