ক্যাপশন: জাতিসংঘ
জাতিসংঘের আর্থিক কাঠামোয় সংকট: মহাসচিবের হুঁশিয়ারি ও সদস্য রাষ্ট্রের ভূমিকা
সম্পাদনা করেছেন: gaya ❤️ one
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস সদস্য রাষ্ট্রগুলোর প্রতি পাঠানো এক জরুরি চিঠিতে বিশ্ব সংস্থার কাঠামোগত আর্থিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। ২৮ জানুয়ারি তারিখযুক্ত এই চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন যে, বকেয়া চাঁদা পরিশোধ না হলে এবং বিদ্যমান বাজেট বিধি সংশোধন না হলে সংস্থাটি এক অভূতপূর্ব আর্থিক সঙ্কটের সম্মুখীন হতে পারে। গুতেরেস স্পষ্ট জানিয়েছেন যে বর্তমান গতিপথ বজায় থাকলে আগামী বছরের জুলাই মাসের মধ্যেই জাতিসংঘের হাতে থাকা নগদ অর্থ নিঃশেষিত হয়ে যেতে পারে।
তিনি ১৯৩টি সদস্য দেশের রাষ্ট্রদূতদের কাছে পাঠানো বার্তায় উল্লেখ করেন যে, যদি সদস্য রাষ্ট্রগুলো তাদের আইনি বাধ্যবাধকতা অনুযায়ী সময়মতো এবং সম্পূর্ণ চাঁদা পরিশোধ না করে, তবে সংস্থার আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা অসম্ভব হবে এবং আর্থিক নিয়মাবলীতে পরিবর্তন আনা অপরিহার্য হয়ে পড়বে। এই সংকট গভীর হওয়ার পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে দেখা যাচ্ছে প্রধান দাতা দেশগুলোর অর্থ প্রদানে অনিয়ম, বিশেষত যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা। জাতিসংঘের মূল বাজেটে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ ২২ শতাংশ এবং চীনের অংশ ২০ শতাংশ হলেও, যুক্তরাষ্ট্র নিয়মিত বাজেট এবং শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাধ্যতামূলক অর্থ প্রদান এড়িয়ে চলছে।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন একাধিক জাতিসংঘ সংস্থা থেকে সরে আসার পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে, যা এই তারল্য সংকটকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। ট্রাম্পের পদক্ষেপের প্রতিক্রিয়ায় তিনি 'কাউন্সিল অফ পিস' নামক একটি বিকল্প কাঠামো তৈরির কথাও বলেছেন, যা জাতিসংঘের কেন্দ্রীয় ভূমিকাকে চ্যালেঞ্জ জানাতে পারে। মহাসচিবের তথ্যানুসারে, ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মোট বকেয়া চাঁদার পরিমাণ রেকর্ড ১.৫৬৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছিল, যার মাত্র ৭৭.০ শতাংশ আদায় সম্ভব হয়েছিল। ২৯ জানুয়ারি, ২০২৬, বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ১৯৩টি সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে মাত্র ৩৬টি দেশ তাদের ২০২৬ সালের নিয়মিত চাঁদা পুরোপুরি পরিশোধ করেছে।
এই আর্থিক চাপের মুখে, জাতিসংঘ ২০২৬ সালের জন্য তার বাজেট ৭.০ শতাংশ হ্রাস করে ৩.৪৫ বিলিয়ন ডলারে নামিয়ে এনেছে। পূর্ববর্তী বছরগুলোতেও আর্থিক টানাপোড়েন দেখা গেলেও, গুতেরেসের মতে এবারের পরিস্থিতি ভিন্ন, কারণ নিয়মিত বাজেটের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে। আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য মহাসচিব দুটি সুস্পষ্ট পথ বাতলে দিয়েছেন: হয় সদস্য রাষ্ট্রগুলো তাদের আর্থিক দায়িত্ব পুরোপুরি পালন করবে, অথবা জাতিসংঘের আর্থিক পরিচালনার মূল নীতিগুলো পুনর্বিবেচনা করতে হবে। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, বর্তমান নিয়মে বাজেট বাস্তবায়ন সম্ভব না হলে অব্যবহৃত অর্থ সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে ফেরত দিতে হয়, যা এমন এক পরিস্থিতিতে সমস্যা তৈরি করছে যেখানে প্রাপ্তিহীন অর্থ ফেরত দেওয়ার প্রশ্ন উঠছে।
এই সংকটের মধ্যে, রাশিয়া নিয়মিত বাজেটে অতিরিক্ত ৭১ মিলিয়ন ডলার প্রদান করলেও, সেপ্টেম্বরের তথ্য অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া এবং মেক্সিকো সবচেয়ে বেশি বকেয়া রাখা চারটি দেশের মধ্যে ছিল। জাতিসংঘের মুখপাত্র ফারহান হক ৩০ জানুয়ারি শুক্রবার এক সংবাদ সম্মেলনে এই পরিস্থিতিকে সংস্থার চলমান কার্যক্রমের জন্য প্রয়োজনীয় তারল্যের অভাব তুলে ধরে সংকটময় পর্যায় হিসেবে অভিহিত করেছেন। মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচের জাতিসংঘ বিষয়ক পরিচালক লুই শারবোনো ট্রাম্পের প্রস্তাবিত 'বোর্ড অব পিস'-কে 'পে-টু-প্লে' বৈশ্বিক ক্লাব হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন, যেখানে ১০০ কোটি ডলার ফি দিয়ে স্থায়ী সদস্যপদ লাভের সুযোগ রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা এবং সদস্য রাষ্ট্রগুলোর আর্থিক অঙ্গীকারের প্রতি দায়বদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, যা বিশ্বব্যাপী মানবিক ও শান্তি রক্ষা কার্যক্রমের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।
উৎসসমূহ
Deutsche Welle
The National News
Caliber.Az
The Washington Post
The Patriot KEIB AM 1150
United Nations
