পর্তুগালের ভাগুশে ৮৭ মিলিয়ন বছরের প্রাচীন সপুষ্পক উদ্ভিদের জীবাশ্ম আবিষ্কার
সম্পাদনা করেছেন: An goldy
২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসে পর্তুগিজ গবেষকরা একটি যুগান্তকারী প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কারের কথা বিশ্ববাসীকে জানিয়েছেন। তারা প্রায় ৮৭ মিলিয়ন বছর আগের একটি সপুষ্পক উদ্ভিদের ফলের অত্যন্ত সুসংরক্ষিত জীবাশ্ম খুঁজে পেয়েছেন, যা ভূতাত্ত্বিক সময়রেখা অনুযায়ী ক্রিটেশিয়াস যুগের শেষদিকের 'কোনিয়াকিয়ান' (Coniacian) সময়ের বলে নির্ধারিত হয়েছে। এই বিরল পালেয়ন্টোলজিক্যাল নমুনাগুলো আভেইরো জেলার অন্তর্গত ভাগুশ মিউনিসিপ্যালিটির সেয়াদৌরো (Seadouro) অঞ্চলের নিকটবর্তী পলল স্তর থেকে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে উদ্ধার করা হয়েছে। এই আবিষ্কারটি প্রাগৈতিহাসিক যুগে আইবেরিয়ান উপদ্বীপে এনজিওস্পার্ম বা সপুষ্পক উদ্ভিদের বিবর্তনীয় ধারা এবং তাদের বিস্তৃতি বোঝার ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বিজ্ঞানীরা এই জীবাশ্মগুলোকে 'ফাগালেস' (Fagales) বর্গের অন্তর্গত 'এন্ড্রেসিয়ান্থাস' (Endressianthus) গণের একটি অংশ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এই নমুনাগুলো বিশ্লেষণের সময় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গসংস্থানিক বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা গেছে, যার মধ্যে সম্ভাব্য পুংকেশরীয় তন্তু এবং গাইনোসিয়াম উল্লেখযোগ্য। এর পাশাপাশি সেখানে 'নর্যাপোলস' (Normapolles) টাইপের পরাগরেণুর উপস্থিতিও বৈজ্ঞানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়েছে। এই আবিষ্কারটি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করে যে, পর্তুগালের আদিম উদ্ভিদজগতে এই বিশেষ সপুষ্পক উদ্ভিদ গোষ্ঠীটি ক্রিটেশিয়াস যুগের শেষভাগে বেশ দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত ছিল। উল্লেখ্য যে, এর আগেও পর্তুগালের মিরা এবং এসগুইরা অঞ্চলে 'এন্ড্রেসিয়ান্থাস মিরেনসিস' (Endressianthus miraensis) এবং 'এন্ড্রেসিয়ান্থাস ফোভোকার্পাস' (Endressianthus foveocarpus) নামক নতুন প্রজাতির সন্ধান পাওয়া গিয়েছিল, যা এই অঞ্চলের সমৃদ্ধ উদ্ভিদ ইতিহাসের সাক্ষ্য দেয়।
অত্যাধুনিক স্ক্যানিং ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপি ব্যবহার করে পরিচালিত বিস্তারিত অঙ্গসংস্থানিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে যে, এই স্ত্রী ফুলগুলোতে একটি নিম্নমুখী ডিম্বাশয় এবং অত্যন্ত ক্ষুদ্র, সূঁচালো আকৃতির পেরিয়ান্থ বিদ্যমান ছিল। তাদের গাইনোসিয়াম ছিল দ্বিবীজপত্রী এবং সিনকার্পাস প্রকৃতির, যা উদ্ভিদের প্রজনন প্রক্রিয়ার জটিলতাকে নির্দেশ করে। সংগৃহীত পরাগরেণু বা 'নর্যাপোলস' বিশ্লেষণ করে গবেষকরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে, ক্রিটেশিয়াস যুগের শেষভাগের শুষ্ক বা আধা-শুষ্ক বাস্তুসংস্থানে এই প্রাচীন উদ্ভিদগুলো পরাগায়নের জন্য মূলত বাতাসের ওপর নির্ভর করত। এন্ড্রেসিয়ান্থাস পুরুষ ফুলগুলোর বিশেষ গঠনগত বৈশিষ্ট্য, যেমন ছোট তন্তুযুক্ত পুংকেশর এবং দীর্ঘায়িত টেট্রাস্পোরঞ্জিয়েট পরাগধানী, এই উদ্ভিদ গোষ্ঠীর একটি অনন্য চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য হিসেবে গবেষকদের কাছে ধরা দিয়েছে।
যদিও এই নতুন প্রজাতিটির সাথে বর্তমান সময়ের 'বেতুলেসি' (Betulaceae) পরিবারের বেশ কিছু গঠনগত সাদৃশ্য লক্ষ্য করা যায়, তবুও ফাগালেস বর্গের মধ্যে এন্ড্রেসিয়ান্থাসের সঠিক শ্রেণিবিন্যাস নিয়ে বৈজ্ঞানিক মহলে এখনও বিতর্ক ও আলোচনা চলছে। নর্যাপোলস টাইপের পরাগরেণুর উপস্থিতি একে ফাগালেস বর্গের সাথে সরাসরি যুক্ত করলেও, পর্তুগালের অন্যান্য আবিষ্কার যেমন 'নরমান্থাস মিরেনসিস' (Normanthus miraensis) থেকে এটি স্পষ্ট যে, এই প্রাচীন সপুষ্পক উদ্ভিদগুলোকে সর্বদা বর্তমানের আধুনিক উদ্ভিদ পরিবারের ছাঁচে ফেলা সম্ভব হয় না। আদি ক্রিটেশিয়াস যুগের 'সাপোর্টান্থাস' (Saportanthus) গণের অধ্যয়ন সপুষ্পক উদ্ভিদের প্রাথমিক বিবর্তনের জটিলতাকে আরও গভীরভাবে তুলে ধরে। মধ্য ইউরোপের 'ওয়ালবেকিয়া' (Walbeckia) গণের মতো অন্যান্য নর্যাপোলস আবিষ্কারের প্রেক্ষাপট এই গোষ্ঠীর অঙ্গসংস্থানিক বৈচিত্র্যকে প্রদর্শন করে, যা এন্ড্রেসিয়ান্থাসের মতো প্রতিটি নতুন নমুনার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণের গুরুত্বকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
পরিশেষে, ভাগুশে প্রাপ্ত এই অনন্য আবিষ্কারটি প্রাচীন উদ্ভিদের প্রজনন কাঠামো সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের কাছে এক অমূল্য এবং প্রত্যক্ষ তথ্যভাণ্ডার সরবরাহ করেছে। এটি মেসোজোয়িক যুগের ল্যান্ডস্কেপে পর্তুগালের সপুষ্পক উদ্ভিদের জটিল গঠন এবং তাদের প্রাচীনকাল থেকেই সুপ্রতিষ্ঠিত অবস্থানের বিষয়টি পুনরায় দৃঢ়ভাবে নিশ্চিত করেছে। এই ধরণের জীবাশ্ম বিশ্লেষণ আমাদের পৃথিবীর প্রাচীন উদ্ভিদজগতের বিবর্তনীয় পর্যায়গুলো এবং জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে তাদের খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষমতা বুঝতে বিজ্ঞানীদের ব্যাপকভাবে সহায়তা করছে, যা ভবিষ্যতের উদ্ভিদ গবেষণায় নতুন মাত্রা যোগ করবে।
6 দৃশ্য
উৎসসমূহ
TV Europa
Observador
Notícias de Coimbra
Região de Aveiro
Jornal o Campeão
এই বিষয়ে আরও খবর পড়ুন:
আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।
