ব্রিটিশ সাংবাদিকের প্রচেষ্টায় নির্জন মুয়েন দ্বীপ এখন বিশ্বের ক্ষুদ্রতম জাতীয় উদ্যান

সম্পাদনা করেছেন: An goldy

১৯৬২ সালে ব্রিটিশ সাংবাদিক ব্র্যান্ডন গ্রিমশ (Brendon Grimshaw) সেশেলস দ্বীপপুঞ্জের এক পরিত্যক্ত দ্বীপ মুয়েন (Moyenne) ক্রয় করেন। ইংল্যান্ডের ইয়র্কশায়ারে জন্ম নেওয়া গ্রিমশ এর আগে পূর্ব আফ্রিকান সংবাদমাধ্যমের সম্পাদক হিসেবে কাজ করতেন। তিনি মাত্র ৮,০০০ পাউন্ডের বিনিময়ে ৯.৯ হেক্টরের এই ভূখণ্ডটি কিনেছিলেন। নিজের উজ্জ্বল ক্যারিয়ার বিসর্জন দিয়ে তিনি এই দ্বীপটিকে উদ্ভিদ ও প্রাণিকুলের এক অভয়ারণ্যে পরিণত করার মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে কাজ শুরু করেন। তার এই পদক্ষেপটি ছিল মূলত প্রকৃতির প্রতি অগাধ ভালোবাসা এবং পরিবেশ সংরক্ষণের এক বিরল দৃষ্টান্ত।

এক সময় ঝোপঝাড়ে পূর্ণ এবং অবহেলিত এই দ্বীপটিকে গ্রিমশ এবং তার স্থানীয় বন্ধু রেনে অ্যান্টোইন লাফর্চুন (Rene Antoine Lafortune) দীর্ঘদিনের অক্লান্ত পরিশ্রমে পুনর্গঠন করেন। দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে তারা সেখানে নিজ হাতে প্রায় ১৬,০০০ গাছ রোপণ করেন, যার মধ্যে মূল্যবান মেহগনি গাছও অন্তর্ভুক্ত ছিল। বনায়নের পাশাপাশি তারা দ্বীপের ভেতর পর্যটকদের চলাচলের জন্য প্রায় ৪.৮ কিলোমিটার দীর্ঘ প্রাকৃতিক হাঁটার পথ তৈরি করেন। তাদের এই নিরলস প্রচেষ্টার ফলে বিলুপ্তপ্রায় বিশালাকার কচ্ছপ এবং প্রচুর সংখ্যক পাখি পুনরায় এই দ্বীপে ফিরে আসতে শুরু করে, যা দ্বীপটির বাস্তুসংস্থানকে সমৃদ্ধ করে তোলে।

বর্তমানে মুয়েন দ্বীপটি ১০০টিরও বেশি বিশালাকার কচ্ছপের নিরাপদ আবাসস্থল, যে প্রজাতিটি ১৯০০-এর দশকের শুরুতে প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল। এছাড়া এখানে প্রায় ২,০০০ প্রজাতির পাখির আনাগোনা রয়েছে যা দ্বীপটিকে জীববৈচিত্র্যের এক অনন্য কেন্দ্রে পরিণত করেছে। গ্রিমশর ২০ বছরের দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর দ্বীপটি সেন্ট অ্যান মেরিন ন্যাশনাল পার্কের (Ste Anne Marine National Park) অংশ হিসেবে স্বীকৃতি পায়। এটি আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্বের ক্ষুদ্রতম জাতীয় উদ্যান হিসেবে ঘোষিত হয়, যা গ্রিমশর দীর্ঘদিনের লবিং এবং পরিবেশবাদী আন্দোলনের এক সার্থক পরিণতি হিসেবে গণ্য করা হয়।

ব্র্যান্ডন গ্রিমশ ১৯৭৩ সাল থেকে ২০১২ সালের জুলাই মাসে ৮৬ বছর বয়সে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এই দ্বীপেই স্থায়ীভাবে বসবাস করতেন। দ্বীপটিকে বাণিজ্যিক উন্নয়নের হাত থেকে রক্ষা করতে এবং এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অটুট রাখতে তিনি ৫০ মিলিয়ন ডলারের বিশাল বিক্রয় প্রস্তাবও অবলীলায় ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। তার মৃত্যুর পর দ্বীপটির ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব নেয় 'মুয়েন আইল্যান্ড ফাউন্ডেশন' (Moyenne Island Foundation)। গ্রিমশর দীর্ঘদিনের বন্ধু সুকেতু প্যাটেলের (Suketu Patel) নেতৃত্বে এই ফাউন্ডেশন বর্তমানে দ্বীপের বাস্তুসংস্থান রক্ষায় পর্যটকদের প্রবেশাধিকার অত্যন্ত কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করে থাকে।

বিশ্বের অন্যান্য জাতীয় উদ্যানের তুলনায় মুয়েন দ্বীপে প্রতি একক এলাকায় প্রজাতির ঘনত্ব অনেক বেশি, যা এর সফল পুনর্গঠন এবং সংরক্ষণের উজ্জ্বল প্রমাণ দেয়। গ্রিমশর উইল বা শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী, এই দ্বীপটি সেশেলসের স্থানীয় বাসিন্দা এবং বিশ্বের সকল জাতি ও ধর্মের পর্যটকদের জন্য প্রার্থনা, শান্তি, প্রশান্তি, বিশ্রাম এবং জ্ঞান অর্জনের একটি পবিত্র স্থান হিসেবে সংরক্ষিত রয়েছে। তার এই মহান সৃষ্টি আজও বিশ্বজুড়ে পরিবেশ প্রেমীদের কাছে এক অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

7 দৃশ্য

উৎসসমূহ

  • Noticias Ambientales

  • Noticias Ambientales

  • All That's Interesting

আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।