নতুন প্রজাতির সন্ধানে বিজ্ঞানীদের অভাবনীয় সাফল্য: প্রতি বছর ১৬,০০০-এর বেশি নতুন জীব আবিষ্কৃত হচ্ছে

সম্পাদনা করেছেন: An goldy

আধুনিক বিজ্ঞান বর্তমানে নতুন নতুন প্রজাতির নামকরণের এক স্বর্ণযুগ অতিক্রম করছে। অ্যারিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন জে. উইয়েন্সের (John J. Wiens) নেতৃত্বে পরিচালিত একটি সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে যে, প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে ১৬,০০০-এরও বেশি নতুন প্রজাতির আনুষ্ঠানিক নিবন্ধন সম্পন্ন হচ্ছে। এই অভূতপূর্ব গতি নির্দেশ করে যে, আমাদের পৃথিবী এখনও অজানা রহস্যে ঘেরা এবং বিজ্ঞানীরা নিরলসভাবে সেই রহস্য উন্মোচনে কাজ করে যাচ্ছেন। এই গবেষণার ফলাফলগুলো প্রমাণ করে যে, ট্যাক্সোনমি বা শ্রেণীবিন্যাসবিদ্যা বর্তমানে আগের চেয়ে অনেক বেশি সক্রিয় এবং কার্যকর হয়ে উঠেছে।

২০১৫ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরের ট্যাক্সোনমিক রেকর্ড বিশ্লেষণ করে গবেষকরা অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক ফলাফল পেয়েছেন। এই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বর্তমানে পরিচিত মোট প্রজাতির প্রায় ১৫ শতাংশ নথিভুক্ত করা হয়েছে, যা বিজ্ঞানের ইতিহাসে একটি মাইলফলক। বার্ষিক এই তালিকায় ১০,০০০-এর বেশি নতুন প্রাণীর প্রজাতি (যার বেশিরভাগই সন্ধিপদী ও পতঙ্গ), প্রায় ২,৫০০ প্রজাতির উদ্ভিদ এবং প্রায় ২,০০০ নতুন প্রজাতির ছত্রাক অন্তর্ভুক্ত ছিল। আধুনিক ট্যাক্সোনমির জনক কার্ল লিনিয়াস (Carl Linnaeus) তিন শতাব্দী ধরে মাত্র ১০,০০০ প্রজাতির বর্ণনা দিয়েছিলেন, যা বর্তমান সময়ের এই ব্যাপক অগ্রগতির সাথে তুলনামূলকভাবে অনেক কম এবং এটি আধুনিক বিজ্ঞানের সক্ষমতাকে ফুটিয়ে তোলে।

নতুন জীবন রূপের এই দ্রুত বর্ণনা বর্তমানের প্রাক্কলিত বিলুপ্তির হারের তুলনায় অনেক বেশি, যা বছরে মাত্র দশটি প্রজাতি বলে ধারণা করা হয়। তবে এই পরিসংখ্যানটি কিছুটা স্বস্তিদায়ক হলেও পরিবেশবিদদের জন্য এটি একটি বড় সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করছে। কারণ জলবায়ু পরিবর্তন, দূষণ এবং প্রাকৃতিক আবাসস্থল ধ্বংসের ফলে প্রায় ১০ লক্ষ প্রজাতি বিলুপ্তির হুমকির মুখে রয়েছে বলে যে অন্ধকারাচ্ছন্ন পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, তার বিপরীতে এই আবিষ্কারের হার বিজ্ঞানীদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এই বৈপরীত্য আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, নতুন প্রজাতি আবিষ্কারের পাশাপাশি বিদ্যমান প্রজাতিগুলোকে রক্ষা করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

বিজ্ঞানের এই অভাবনীয় সাফল্যের পেছনে মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে উন্নত প্রযুক্তি, বিশেষ করে মলিকুলার সিকোয়েন্সিংয়ের ব্যাপক ব্যবহার। স্যাঙ্গার (Sanger) পদ্ধতি থেকে শুরু করে নেক্সট-জেনারেশন সিকোয়েন্সিং (NGS) প্রযুক্তির প্রয়োগ বিজ্ঞানীদের এমন সব 'ক্রিপ্টিক' বা ছদ্মবেশী প্রজাতি শনাক্ত করতে সাহায্য করেছে যা খালি চোখে বা সাধারণ পর্যবেক্ষণে আলাদা করা অসম্ভব ছিল। অ্যারিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেছেন যে, যতক্ষণ পর্যন্ত একটি প্রজাতির বৈজ্ঞানিক বর্ণনা সম্পন্ন না হয়, ততক্ষণ পর্যন্ত সেটি সংরক্ষণ প্রচেষ্টার আওতায় আসে না। অর্থাৎ, একটি প্রজাতিকে বিলুপ্তির হাত থেকে বাঁচাতে হলে প্রথমে সেটিকে বৈজ্ঞানিকভাবে শনাক্ত করা এবং তার অস্তিত্বের প্রমাণ দেওয়া অপরিহার্য।

'বারকোড অফ লাইফ' (Barcode of Life)-এর মতো বৈশ্বিক প্রকল্পগুলো সমস্ত প্রজাতির বিবর্তনীয় সম্পর্ক এবং জেনেটিক বৈচিত্র্য বোঝার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। জীববৈচিত্র্য রক্ষা করা কেবল পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার জন্যই নয়, বরং মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা এবং সুস্বাস্থ্যের জন্য অপরিহার্য ইকোসিস্টেম পরিষেবা নিশ্চিত করার জন্যও জরুরি। তাই মানুষের সৃষ্ট পরিবেশগত চাপের মুখে প্রজাতির এই দ্রুত বর্ণনা আসলে সময়ের সাথে এক কঠিন প্রতিযোগিতার নামান্তর। প্রতিটি নতুন আবিষ্কার আমাদের প্রকৃতির অমূল্য সম্পদকে রক্ষার নতুন সুযোগ করে দেয় এবং আমাদের বাস্তুসংস্থান সম্পর্কে জ্ঞানকে আরও সমৃদ্ধ করে।

প্রকৃতি সংরক্ষণের এই বৈশ্বিক প্রচেষ্টায় নতুন প্রজাতির দ্রুত শনাক্তকরণ কেবল বৈজ্ঞানিক কৌতূহল মেটানো নয়, বরং এটি একটি টেকসই ভবিষ্যৎ গড়ার অন্যতম প্রধান হাতিয়ার। বিজ্ঞানীরা মনে করেন যে, যদি আমরা আমাদের চারপাশের জীবজগত সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ ধারণা না রাখি, তবে অনেক প্রজাতি হয়তো আমাদের জানার আগেই পৃথিবী থেকে চিরতরে হারিয়ে যাবে। তাই বর্তমানের এই উচ্চ গতির ট্যাক্সোনমিক গবেষণা পরিবেশগত বিপর্যয় রোধে একটি শক্তিশালী ঢাল হিসেবে কাজ করছে। এই গতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখা গেলে ভবিষ্যতে আমরা হয়তো পৃথিবীর জীববৈচিত্র্যের একটি পূর্ণাঙ্গ মানচিত্র তৈরি করতে সক্ষম হব, যা আগামী প্রজন্মের জন্য এক অমূল্য সম্পদ হবে।

8 দৃশ্য

উৎসসমূহ

  • ECOticias.com

  • Ecoticias

  • ScienceDaily

  • SciTechDaily

  • EurekAlert! (California Academy of Sciences)

  • Noticias Ambientales

আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।