সাম্প্রতিক এক বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে যে, নির্দিষ্ট কিছু কুকুরের মধ্যে অসাধারণ বুদ্ধিবৃত্তিক দক্ষতা রয়েছে, যার ফলে তারা কেবল তাদের মালিকদের কথোপকথন শুনেই নতুন বস্তুর নাম শিখে নিতে পারে। এই বিশেষ কুকুরগুলোকে বিজ্ঞানীরা "গিফটেড ওয়ার্ড লার্নার" (Gifted Word Learner বা GWL) বা "মেধাবী শব্দ শিক্ষার্থী" হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। গবেষক শেনি ড্রোর এবং তার সহকর্মীরা এই রহস্যময় ক্ষমতাটি গভীরভাবে পর্যালোচনার জন্য দশটি এমন কুকুরের ওপর গবেষণা চালিয়েছেন। এই প্রাণীদের নতুন শব্দের সাথে সংশ্লিষ্ট বস্তুর মিল খুঁজে বের করার ক্ষমতা ১৮ থেকে ২৩ মাস বয়সী শিশুদের শব্দ শেখার প্রক্রিয়ার সাথে তুলনীয়। এই আবিষ্কার প্রমাণ করে যে, অন্যদের পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করে কোনো বস্তুর সাথে তার নামের সম্পর্ক স্থাপন করার ক্ষমতা কেবল মানুষেরই অনন্য বৈশিষ্ট্য নয়।
কুকুরদের স্বাভাবিক পারিবারিক পরিবেশে পরিচালিত এই গবেষণাটি তুলে ধরে যে, GWL কুকুরদের শব্দভাণ্ডার সমৃদ্ধ হওয়ার পেছনে খেলার ছলে সামাজিক যোগাযোগ একটি বড় ভূমিকা পালন করে, যা অনেকটা শিশুদের ভাষা শেখার মতোই। খাঁচায় বন্দি এবং হাজার হাজার বার প্রশিক্ষিত প্রাণীদের তুলনায় এই মেধাবী কুকুরগুলো প্রাকৃতিক খেলার মাধ্যমেই শিখতে পারে। বুদাপেস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা দীর্ঘকাল ধরে কুকুরের বুদ্ধিমত্তা নিয়ে কাজ করছেন এবং তাদের এই কাজগুলো কুকুরের জ্ঞানীয় ক্ষমতা সম্পর্কে আমাদের প্রচলিত ধারণা বদলে দিয়েছে। বিশেষ করে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে, কোনো আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ ছাড়াই এই কুকুরগুলো খুব দ্রুত নতুন খেলনার নাম মনে রাখতে পারে।
গবেষক দলটি আগে লক্ষ্য করেছিলেন যে, এই মেধাবী কুকুরগুলো কেবল বাহ্যিক আকৃতি বা রঙের ওপর ভিত্তি করে নয়, বরং কাজের ধরনের ওপর ভিত্তি করেও খেলনার নামকরণ করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, যদি একটি কুকুর এমন কোনো খেলনার নাম জানে যা দিয়ে 'অ্যাপোর্ট' বা কুড়িয়ে আনার খেলা খেলা হয়, তবে সে একই ধরণের অন্য কোনো বস্তুর ক্ষেত্রেও সেই নামটি ব্যবহার করতে পারে, যদিও সেটি দেখতে সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারে। এটি নির্দেশ করে যে, কুকুররা কেবল দৃশ্যমান বৈশিষ্ট্যের ওপর নির্ভর না করে বস্তুর উপযোগিতা বা উদ্দেশ্যের ভিত্তিতে সেগুলোকে বিভিন্ন শ্রেণিতে ভাগ করতে সক্ষম।
পরীক্ষার সময় যখন কুকুরদের নয়টি পরিচিত খেলনার মধ্য থেকে একটি নতুন খেলনা বেছে নিতে বলা হয়, তখন সরাসরি নাম বললে তারা ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রে সফল হয়। অন্যদিকে, কেবল আড়ি পেতে বা কথোপকথন শুনে নাম শিখলে তাদের সাফল্যের হার ছিল প্রায় ৮০ শতাংশ, যা পরিসংখ্যানগতভাবে খুব একটা আলাদা নয়। এটি তাদের প্রখর মনোযোগ এবং মানসিক নমনীয়তাকে ফুটিয়ে তোলে। গবেষকরা উল্লেখ করেছেন যে, মানুষের যোগাযোগ ব্যবস্থা বোঝার এই ক্ষমতা সত্যিই বিস্ময়কর। যেখানে অধিকাংশ কুকুর 'বস' বা 'শোয়া'র মতো আদেশের শব্দগুলো সহজেই শেখে, সেখানে মাত্র অল্প কিছু কুকুর 'ফ্রিসবি' বা 'দড়ি'র মতো বস্তুর নাম মনে রাখতে পারে। ধারণা করা হয়, প্রতি এক হাজার কুকুরের মধ্যে মাত্র একজনের এই বিশেষ ক্ষমতা থাকে এবং এর সাথে নিবিড় প্রশিক্ষণের কোনো সম্পর্ক নেই।
কারেন্ট বায়োলজি (Current Biology) জার্নালে প্রকাশিত এই গবেষণাপত্রটি বুদাপেস্টের ইওটভোস লোরান্ড বিশ্ববিদ্যালয় এবং স্পেন ও কোস্টা রিকার বিশেষজ্ঞদের একটি যৌথ প্রয়াস। এই গবেষণায় এমন ৪১টি পোষা কুকুরকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল যারা অন্তত পাঁচটি খেলনার নাম জানত। পোর্টেবল ইলেকট্রোএনসেফালোগ্রাফ (EEG) ব্যবহারের মাধ্যমে দেখা গেছে যে, নতুন নাম শোনার সময় এই কুকুরদের মস্তিষ্কের টেম্পোরাল লোবে একটি বিশেষ তরঙ্গ সৃষ্টি হয়, যা মানুষের শব্দ শোনার প্রতিক্রিয়ার মতোই। এটি নিশ্চিত করে যে, কুকুররা কেবল মানুষের কণ্ঠস্বর বা অঙ্গভঙ্গিতে সাড়া দিচ্ছে না, বরং তারা শব্দ ও বস্তুর মধ্যে একটি স্থায়ী মানসিক সংযোগ তৈরি করছে। বিশেষ করে বর্ডার কলি প্রজাতির কুকুররা এক্ষেত্রে শীর্ষে রয়েছে, যেমন বিখ্যাত কুকুর 'চেজার' এক হাজারেরও বেশি নাম মনে রাখতে পারত। এই গবেষণাটি বিভিন্ন প্রজাতির মধ্যে শব্দ শেখার বিবর্তন এবং শ্রেণিবিন্যাস বোঝার ক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।




