গবেষকরা এক বিশেষ শ্রেণির কুকুরকে চিহ্নিত করেছেন, যাদের 'লেবেল-লার্নার' বা নাম-শিক্ষার্থী হিসেবে শ্রেণীবদ্ধ করা হয়। এই কুকুরগুলি কেবল তাদের নামের ভিত্তিতে শত শত বস্তুকে চিনতে পারার অসাধারণ ক্ষমতা প্রদর্শন করে। আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানীদের একটি দল এই ব্যতিক্রমী কুকুরদের সাধারণ কুকুরের থেকে আলাদা করে এমন বৈশিষ্ট্যগুলি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করেছে। গবেষণার মূল ফলাফলগুলি ইঙ্গিত দেয় যে এই বিশেষ দক্ষতার মূলে রয়েছে তাদের সহজাত ব্যক্তিত্বের গুণাবলী: জন্মগত কৌতূহল, গভীর মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষমতা এবং উচ্চ মাত্রার আত্মনিয়ন্ত্রণ বা বাধাদানের ক্ষমতা।
এই ধরনের ব্যতিক্রমী কুকুর খুঁজে পাওয়া বেশ কঠিন। বর্তমানে যুক্তরাজ্য, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, নেদারল্যান্ডস, সুইজারল্যান্ড এবং জার্মানি মিলিয়ে মাত্র এগারোটি এমন কুকুরকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে, যা এই গোষ্ঠীর বিরলতা প্রমাণ করে। এই প্রাণীগুলির মালিকেরা একটি নাগরিক বিজ্ঞান প্রকল্পের অংশ হিসেবে প্রমিত পরীক্ষাগুলির ভিডিও রেকর্ড করেছিলেন। এই 'লেবেল-লার্নার' কুকুরগুলি নতুন বস্তুর প্রতি উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি আগ্রহ দেখায় এবং বিভ্রান্তি সৃষ্টিকারী বিষয়গুলিকে উপেক্ষা করে একটি নির্দিষ্ট বস্তুর উপর মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করার ক্ষেত্রে অসাধারণ দক্ষতা রাখে। শেখার প্রক্রিয়ার সময় হঠাৎ আসা প্রবৃত্তিগুলিকে দমন করার জন্য শক্তিশালী আত্মনিয়ন্ত্রণের উপস্থিতি ছিল একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নির্ণায়ক।
এর আগে, ২০২০ সালে হাঙ্গেরির বিজ্ঞানীরা সামাজিক মাধ্যমে একটি প্রচারণার মাধ্যমে আরও বেশি সংখ্যক প্রতিভাবান কুকুর খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছিলেন। সেই অভিযানে ৯টি দেশ থেকে মোট ৪১টি মেধাবী কুকুরকে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়েছিল। সেই সময় চিহ্নিত কুকুরগুলির মধ্যে বর্ডার কলি প্রজাতির আধিপত্য ছিল লক্ষণীয় (৫৬ শতাংশ বা ২৩টি কুকুর)। বর্তমান নতুন গবেষণায় পরীক্ষিত কুকুরগুলির গড় বয়স ছিল ৩.৮ বছর। ১৭২টি শব্দ ও বাক্যাংশের একটি নিয়ন্ত্রণ তালিকার ভিত্তিতে পরিচালিত পরীক্ষাগুলিতে দেখা যায় যে সবচেয়ে বেশি শিখতে পারা কুকুরগুলি ২০০টিরও বেশি শব্দ ও বাক্যের প্রতি সাড়া দিতে সক্ষম, যা প্রায় দুই বছর বয়সী একটি শিশুর শব্দভান্ডারের সমতুল্য।
সাধারণত, একটি গড় গৃহপালিত কুকুর প্রায় ৮৯টি শব্দ ও বাক্য বুঝতে পারে, যার অধিকাংশই হলো নির্দেশাবলী। তবে তাদের শব্দভান্ডারে 'খাবার' বা 'বাড়ি'-এর মতো শব্দও অন্তর্ভুক্ত থাকে। বর্ডার কলি, জার্মান শেফার্ড এবং বিশোঁ ফ্রাইজের মতো পশুপালক ও সঙ্গী কুকুরগুলি মানুষের মৌখিক ও অমৌখিক সংকেত শনাক্ত করার ক্ষেত্রে সেরা পারদর্শিতা দেখায়। এই ফলাফলগুলি ভবিষ্যতে অল্পবয়সী কুকুরদের মধ্যে বিশেষ শেখার ক্ষমতা প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করতে সাহায্য করতে পারে। এর ফলে, এই কুকুরগুলির জন্য পথপ্রদর্শক কুকুর বা থেরাপিউটিক সহকারী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের পথ সুগম হতে পারে।
এই গবেষণা প্রমাণ করে যে কুকুরের বুদ্ধিমত্তা কেবল প্রশিক্ষণের ওপর নির্ভর করে না, বরং তাদের সহজাত মানসিক কাঠামোর ওপরও নির্ভরশীল। কৌতূহল এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের এই সংমিশ্রণই তাদের ভাষার জটিল স্তরগুলি আয়ত্ত করতে সাহায্য করে। এই বৈশিষ্ট্যগুলি চিহ্নিত করা গেলে, ভবিষ্যতে নির্দিষ্ট কাজের জন্য কুকুর নির্বাচন করা আরও বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে করা সম্ভব হবে। এটি কেবল মালিকদের জন্যই নয়, বরং প্রাণীদের কল্যাণের দিক থেকেও একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।




