মিশরের রাজকীয় সমাধিতে তামিল-ব্রাহ্মী শিলালিপি: প্রাচীন বাণিজ্যের গভীরতার প্রমাণ
সম্পাদনা করেছেন: Vera Mo
মিশরের থিবান নেক্রোপলিসের অন্তর্গত ভ্যালি অফ দ্য কিংস-এর অভ্যন্তরে প্রায় ত্রিশটি শিলালিপি আবিষ্কৃত হয়েছে, যা প্রাচীন ভারতীয়দের সুদূর মিশর পর্যন্ত ভ্রমণের সাক্ষ্য বহন করে। এই লিপিগুলির মধ্যে তামিল-ব্রাহ্মী, প্রাকৃত এবং সংস্কৃত ভাষার চিহ্ন পাওয়া গেছে, যা খ্রিস্টীয় প্রথম থেকে তৃতীয় শতকের সময়কালের বলে চিহ্নিত। ফরাসি স্কুল অফ এশিয়ান স্টাডিজ (EFEO)-এর অধ্যাপক শার্লট শ্মিট এবং লوزান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ইংগো স্ট্রাউখ যৌথভাবে ২০২৪ এবং ২০২৫ সালের গবেষণায় এই গুরুত্বপূর্ণ নথিগুলি লিপিবদ্ধ করেন। এই আবিষ্কার প্রমাণ করে যে ভারতীয়দের উপস্থিতি কেবল ভূমধ্যসাগরীয় বাণিজ্যের কেন্দ্রস্থল বেরেনিকের মতো উপকূলীয় বন্দরে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তারা নীল নদের উপত্যকার গভীরে প্রবেশ করেছিল।
শনাক্ত করা শিলালিপিগুলির মধ্যে একটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, যেখানে তামিল বণিক 'சிகை கொற்ன்' (Cikai Koṟraṉ)-এর নাম পাঁচটিরও বেশি সমাধিতে মোট আটবার খোদাই করা হয়েছে। অধ্যাপক শ্মিট উল্লেখ করেছেন যে একটি লিপির কাঠামো, 'Cikai Koṟraṉ - vara kanta' (সিকাই কোরণ এলেন এবং দেখলেন), সমসাময়িক গ্রিক শিলালিপিগুলির একটি প্রচলিত রীতি অনুকরণ করে, যা ইঙ্গিত দেয় যে এই ব্যক্তি স্থানীয় গ্রিক ভাষার লিপি পাঠে সক্ষম ছিলেন। 'কোরণ' শব্দটি বিজয় বা বধ করার মূল থেকে উদ্ভূত, যা চের রাজকীয় দেবী কোরাভাই এবং চের রাজা পিট্টাঙ্কোরণ-এর নামের সাথে সম্পর্কিত, যা সংগম সাহিত্যের 'পুরানানুরু'-তেও পাওয়া যায়। মোট ত্রিশটি লিপির মধ্যে বিশটি তামিল-ব্রাহ্মীতে লেখা, যা নির্দেশ করে যে পরিদর্শকদের প্রধান উৎস ছিল ভারতীয় উপমহাদেশের দক্ষিণ অংশ। অন্যান্য উল্লেখযোগ্য তামিল-ব্রাহ্মী নামগুলির মধ্যে রয়েছে 'கோபான் வரத கண்டன்' (Kopāṉ varata kantan) এবং 'சாத்தன்' (Cāttaṉ)।
এই আবিষ্কারটি বেরেনিকের মতো বন্দর শহরের প্রমাণকে ছাপিয়ে ভ্যালি অফ দ্য কিংসের অভ্যন্তরে তামিল সংস্কৃতির চিহ্ন স্থাপন করেছে, যা নিছক বাণিজ্যের বাইরেও গভীর সাংস্কৃতিক মিথস্ক্রিয়াকে নিশ্চিত করে। গবেষকরা আরও লক্ষ্য করেছেন যে ভারতীয় দর্শনার্থীরা সমাধির অভ্যন্তরে নিজেদের নাম খোদাই করার মাধ্যমে একটি বিদ্যমান ভূমধ্যসাগরীয় প্রথা অনুসরণ করেছিলেন, যা গ্রিক এবং ল্যাটিন পরিদর্শকদের দ্বারাও অনুসরণ করা হত। এই শিলালিপিগুলি কেবল বণিকদের উপস্থিতি নয়, বরং পর্যটকদের মতো সাংস্কৃতিক অন্বেষণকেও তুলে ধরে, যা প্রাচীন ভারতীয়দের গতিশীলতা এবং আত্ম-উপলব্ধির সাক্ষ্য দেয়। তামিল-ব্রাহ্মীর পাশাপাশি সংস্কৃত ও প্রাকৃত লিপির উপস্থিতি উত্তর-পশ্চিম এবং পশ্চিম ভারতের অঞ্চল, যেমন গুজরাট ও মহারাষ্ট্র থেকে আগত ভ্রমণকারীদেরও ইঙ্গিত দেয়। একটি সংস্কৃত শিলালিপিতে একজন ক্ষহরতা রাজার দূতের উল্লেখ রয়েছে যিনি 'এখানে এসেছিলেন', যা প্রথম শতকে পশ্চিম ভারতে ক্ষহরতা রাজবংশের শাসনের পরিপ্রেক্ষিতে ঐতিহাসিক গুরুত্ব বহন করে।
ভ্যালি অফ দ্য কিংস, যা খ্রিস্টপূর্ব ১৬শ শতকে নির্মিত হয়েছিল, রোমান যুগে এক ধরনের প্রাচীন পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল, যেখানে ভূমধ্যসাগরীয় ভ্রমণকারীরা তাদের চিহ্ন রেখে যেত, এবং এখন ভারতীয়দের উপস্থিতি প্রমাণিত হলো। এই আবিষ্কারগুলি প্রাচীন বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংহতির প্রাথমিক রূপ এবং দক্ষিণ এশিয়া ও ভূমধ্যসাগরীয় বিশ্বের মধ্যে গভীর সাংস্কৃতিক সংযোগের প্রমাণ হিসেবে কাজ করে। পূর্বে, ইন্দো-রোমান বাণিজ্যের প্রমাণ মূলত তামিলনাড়ুতে রোমান মুদ্রা এবং বেরেনিকের মতো স্থানে প্রাপ্ত পাত্রের মাধ্যমে পাওয়া যেত। কিন্তু থিবান নেক্রোপলিসের গভীরে এই লিপিগুলি প্রমাণ করে যে ভারতীয় বণিক বা অভিযাত্রীরা বন্দর শহরগুলি অতিক্রম করে মিশরের অভ্যন্তরে সাংস্কৃতিক কেন্দ্রগুলিতেও ভ্রমণ করেছিলেন।
8 দৃশ্য
উৎসসমূহ
Indian Express Tamil
The Hindu
Deccan Herald
The Times of India
Current Affairs Usthadian Academy
এই বিষয়ে আরও খবর পড়ুন:
আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।
