২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ডেনমার্কের অটোমোবাইল বাজারে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। নতুন নিবন্ধিত যানবাহনের মধ্যে ব্যাটারি চালিত বৈদ্যুতিক গাড়ির (BEV) হার দাঁড়িয়েছে ৮১.৬ শতাংশে। Bilstatistik.dk-এর তথ্যের ভিত্তিতে এবং মোবিলিটি ডেনমার্কের (Mobility Denmark) বিশ্লেষণে দেখা গেছে যে, ডেনমার্কে বৈদ্যুতিক গাড়ি এখন আর কেবল শৌখিন পণ্য নয়, বরং এটি একটি গণমুখী পণ্যে পরিণত হয়েছে এবং মূলধারার বাজারে নিজের অবস্থান পাকাপোক্ত করেছে।
এই বছরের ফেব্রুয়ারিতে দেশটিতে মোট ১১,৯৩৩টি নতুন যাত্রীবাহী গাড়ি নিবন্ধিত হয়েছে, যা ২০২৫ সালের একই সময়ের তুলনায় ২.৮ শতাংশ বেশি। ব্যক্তিগত ক্রেতাদের ক্ষেত্রে বৈদ্যুতিক গাড়ির আধিপত্য ছিল আরও বিস্ময়কর, যেখানে ৯৪.৪ শতাংশ নতুন নিবন্ধনই ছিল BEV। ফেব্রুয়ারি মাসে মোট ৯,৭৩৬টি নতুন বৈদ্যুতিক গাড়ি সরবরাহ করা হয়েছে। মোবিলিটি ডেনমার্কের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ম্যাডস রোরভিগ (Mads Rørvig) উল্লেখ করেছেন যে, বর্তমানে সিংহভাগ ভোক্তা তাদের পছন্দের তালিকায় বৈদ্যুতিক মডেলগুলোকেই সবার উপরে রাখছেন।
এই অভাবনীয় সাফল্যের পেছনে মূল চালিকাশক্তি ছিল বৈদ্যুতিক গাড়ির অর্থনৈতিক আকর্ষণ বজায় রাখা। ২০২৬ সালের সরকারি অর্থ আইনের অধীনে বৈদ্যুতিক গাড়ির নিবন্ধন কর বৃদ্ধির যে পরিকল্পনা ছিল, তা এক বছরের জন্য স্থগিত করা হয়েছে এবং ২০২৫ সালের কর হারই বহাল রাখা হয়েছে। এর ফলে ২০২৬ সালে BEV মালিকরা নির্ধারিত করের ৪৮ শতাংশের পরিবর্তে ৪০ শতাংশ হারে কর প্রদানের সুবিধা পাচ্ছেন। এর পাশাপাশি, ১ জানুয়ারি ২০২৬ থেকে বিদ্যুৎ ব্যবহারের ওপর কর কমানো হয়েছে, যা সাধারণ মানুষকে বৈদ্যুতিক গাড়ি ব্যবহারে আরও উৎসাহিত করেছে।
ভোক্তাদের পছন্দের ধরণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, বর্তমানে বড় আকারের বৈদ্যুতিক এসইউভি (SUV) মডেলগুলোর চাহিদা সবচেয়ে বেশি। শীর্ষ বিক্রিত দশটি মডেলের মধ্যে আটটিই এই শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। ফেব্রুয়ারি মাসে ১,৩৬৪টি নিবন্ধনের মাধ্যমে টয়োটা বিজেড৪এক্স (Toyota bZ4X) বিক্রির তালিকায় শীর্ষস্থান দখল করেছে। ভক্সওয়াগেন গ্রুপ তাদের এমইবি (MEB) প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে শীর্ষ দশে চারটি স্থান নিশ্চিত করেছে। এই মডেলগুলো হলো:
- স্কোডা এলরোক (Škoda Elroq) - ৬৮১টি নিবন্ধন
- ভক্সওয়াগেন আইডি.৪ (Volkswagen ID.4) - ৫৭৫টি নিবন্ধন
- স্কোডা এনিয়াক (Škoda Enyaq) - ৪৬৭টি নিবন্ধন
- অডি কিউ৪ ই-ট্রন (Audi Q4 e-tron) - ৪০০টি নিবন্ধন
এছাড়া ৩০০টি নিবন্ধনের মাধ্যমে এক্সপেং জি৬ (Xpeng G6) বাজারে নিজের অবস্থান তৈরি করে নিয়েছে, যা আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার তীব্রতাকেই নির্দেশ করে।
ডেনমার্কের এই অগ্রযাত্রা ইউরোপীয় ইউনিয়নের গড় হারের তুলনায় অনেক বেশি। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ইইউ-তে বৈদ্যুতিক গাড়ির গড় হার ছিল মাত্র ১৯.৩ শতাংশ। তবে নরওয়ে এখনও এই ক্ষেত্রে বিশ্বসেরা অবস্থান ধরে রেখেছে, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে তাদের বাজারে বৈদ্যুতিক গাড়ির হার ছিল ৯৮.০১ শতাংশ। অন্যদিকে, ডেনমার্কের বাজারে চীনা ও ইউরোপীয় নির্মাতাদের ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতার মুখে টেসলার (Tesla) বিক্রি গত বছরের তুলনায় ১৮ শতাংশ কমে ৪১৯টিতে দাঁড়িয়েছে বলে মোবিলিটি ডেনমার্কের তথ্যে উঠে এসেছে।
ডেনমার্ক ঐতিহাসিকভাবেই তার পরিবহন ব্যবস্থাকে কার্বনমুক্ত করার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। ২০৩০ সালের মধ্যে কার্বন ডাই অক্সাইড নিঃসরণ ৭০ শতাংশ কমানোর উদ্দেশ্যে তারা ২০২০ সালেই ৭ লক্ষ ৭৫ হাজার বৈদ্যুতিক গাড়ি রাস্তায় নামানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল। ম্যাডস রোরভিগের মতে, এই অগ্রগতির ধারা বজায় রাখা সরাসরি ভবিষ্যৎ আইনি কাঠামো এবং সরকারের নীতিগত সহায়তার ওপর নির্ভর করছে। ডেনমার্কের এই সাফল্য প্রমাণ করে যে, সঠিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমর্থন থাকলে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিতে রূপান্তর অত্যন্ত দ্রুত সম্ভব।



