সোলার অর্বিটার স্পেসক্রাফ্ট আবিষ্কার করেছে যে সূর্য ফ্লেয়ারটি শুরুতেই দুর্বল বিশৃঙ্খলার সঙ্গে শুরু হয় যা দ্রুত আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থা (ESA)-এর সোলার অরবিটার মহাকাশযানটি শক্তিশালী সৌর শিখা বা সোলার ফ্লেয়ার সৃষ্টির পেছনে ‘চৌম্বকীয় তুষারধস’ (magnetic avalanche) নামক একটি প্রক্রিয়ার প্রত্যক্ষ প্রমাণ সংগ্রহ করেছে। ২০২৪ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর, যখন সোলার অরবিটার তার উপবৃত্তাকার কক্ষপথের সূর্যের সবচেয়ে নিকটতম বিন্দু বা পেরিহেলিয়নে অবস্থান করছিল, তখন এই গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলো সংগ্রহ করা হয়। ২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি ‘অ্যাস্ট্রোনমি অ্যান্ড অ্যাস্ট্রোফিজিক্স’ (Astronomy & Astrophysics) জার্নালে প্রকাশিত এই গবেষণাটি সূর্যের সবচেয়ে তীব্র বিকিরণগুলোর গতিশীলতা সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের ধারণাকে আরও স্পষ্ট করেছে। এটি দীর্ঘদিনের তাত্ত্বিক মডেলগুলোকে নিশ্চিত করে, যা আগে মূলত পরিসংখ্যানগত বিশ্লেষণের ওপর নির্ভরশীল ছিল এবং এখন বাস্তব পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে প্রমাণিত হলো।
এই দ্রুত বর্ধমান প্রক্রিয়া একটি 'আকাশ' তৈরি করে যা পতিত প্লাজমা ব্লব দ্বারা আচ্ছাদিত, এই ভিডিওতে দেখানো হয়েছে।
সূর্য থেকে মাত্র ৪৫ মিলিয়ন কিলোমিটার দূরত্বে অত্যন্ত কাছ থেকে এই পর্যবেক্ষণ চালানো হয়েছিল, যার ফলে ঘটনাটি অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে এবং উচ্চ রেজোলিউশনে ধারণ করা সম্ভব হয়েছে। এম৭.৭ (M7.7) শ্রেণির এই সৌর শিখাটি সৌর ডিস্কের প্রান্ত বা লিম্ব থেকে নিখুঁতভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়। এই গবেষণার একটি বিশেষ দিক ছিল উচ্চ-ফ্রিকোয়েন্সি ইমেজিং ব্যবস্থা, যা প্রতি দুই সেকেন্ড অন্তর সূর্যের চৌম্বকীয় পরিবর্তনগুলো রেকর্ড করেছে। এর ফলে বিজ্ঞানীরা প্রথমবারের মতো সরাসরি দেখতে পেয়েছেন কীভাবে সূর্যের চৌম্বক ক্ষেত্রে ছোট ছোট পুনর্গঠনগুলো তুষারধসের মতো পুঞ্জীভূত হয়ে একটি বিশাল বিস্ফোরণে রূপ নেয়। বিস্ফোরণের প্রায় ৪০ মিনিট আগে, সেখানে পেঁচানো চৌম্বক ক্ষেত্রের একটি অন্ধকার ‘ফিলামেন্ট’ এবং একটি ক্রুশ আকৃতির কাঠামো দেখা গিয়েছিল, যা ধীরে ধীরে উজ্জ্বল হয়ে উঠছিল।
২৩:৪৭ ইউটিসি (UTC) সময়ে বিস্ফোরণের চূড়ান্ত মুহূর্তে চার্জিত কণাগুলো আলোর গতির প্রায় ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত গতিপ্রাপ্ত হয়েছিল, যা প্রতি ঘণ্টায় ৪৩১ থেকে ৫৪০ মিলিয়ন কিলোমিটারের সমান। এই প্রক্রিয়ার সাথে ছিল ‘প্লাজমা ব্লব’ বা প্লাজমা পিণ্ডের বৃষ্টি, যা শিখার মূল পর্যায় শেষ হওয়ার পরেও সূর্যের করোনায় আছড়ে পড়ছিল। বিজ্ঞানীরা লক্ষ্য করেছেন যে, নির্গত সমস্ত শক্তি মহাকাশে ছড়িয়ে পড়ে না; বরং এর একটি অংশ এই প্লাজমা পিণ্ড হিসেবে আশেপাশের প্লাজমাতে স্থানান্তরিত হয়, যা একটি সম্পূর্ণ নতুন পর্যবেক্ষণ। এটি ২০২৬ সালের শুরুর দিকে সূর্যের ক্রমবর্ধমান সক্রিয়তার সময়কালকে বিশেষভাবে চিহ্নিত করে।
এই গবেষণায় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান এবং বিশেষজ্ঞ যুক্ত ছিলেন, যার মধ্যে রয়েছে ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থা (ESA) এবং ম্যাক্স প্লাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর সোলার সিস্টেম রিসার্চ (MPS)-এর লক্ষ্মী প্রদীপ চিট্টা। এছাড়াও এমপিএস-এর পরিচালক এবং পিএইচআই (PHI) যন্ত্রের প্রধান সামি কে. সোলাঙ্কি এবং সোলার অরবিটার প্রকল্পের সহ-প্রধান বিজ্ঞানী মিহো জানভিয়ের এই গবেষণায় নেতৃত্ব দিয়েছেন। চারটি বিশেষ যন্ত্র—EUI, PHI, SPICE এবং STIX-এর সমন্বিত কাজের মাধ্যমেই এই অনন্য তথ্য পাওয়া সম্ভব হয়েছে। ইইউআই (EUI) প্রায় ১ মিলিয়ন ডিগ্রি তাপমাত্রার প্লাজমা পর্যবেক্ষণ করেছে, যেখানে এসটিআইএক্স (STIX) আরও উত্তপ্ত অঞ্চলগুলো চিহ্নিত করেছে যেখানে কণাগুলো তাদের শক্তি সঞ্চয় করছিল।
মহাকাশ আবহাওয়ার প্রেক্ষাপটে এই আবিষ্কারের সরাসরি ব্যবহারিক গুরুত্ব রয়েছে, কারণ শক্তিশালী সৌর শিখাগুলো কৃত্রিম উপগ্রহ এবং পৃথিবীর বিদ্যুৎ গ্রিডকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে সক্ষম। ‘চৌম্বকীয় তুষারধস’ প্রক্রিয়াটি বুঝতে পারলে এই ধরণের ঘটনাগুলোর আরও নির্ভুল পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব হবে। গবেষকরা এখন এই প্রশ্নটি তুলছেন যে, এই একই প্রক্রিয়া কি মহাবিশ্বের অন্যান্য নক্ষত্রের শিখা সৃষ্টির ক্ষেত্রেও একইভাবে কাজ করে কি না। এই আবিষ্কারটি সৌর বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে যা ভবিষ্যতে মহাকাশ গবেষণায় সহায়ক হবে।
সৌর বিজ্ঞানের এই অগ্রগতি আমাদের নক্ষত্র সম্পর্কে প্রচলিত ধারণাগুলোকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করছে। সোলার অরবিটারের পাঠানো এই তথ্যগুলো কেবল তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের জয় নয়, বরং এটি আমাদের প্রযুক্তিগত অবকাঠামো রক্ষার একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে কাজ করবে। সূর্যের রহস্যময় চৌম্বকীয় আচরণ উন্মোচনের মাধ্যমে মানবজাতি মহাকাশ ভ্রমণের ঝুঁকিগুলো আরও ভালোভাবে মোকাবেলা করতে পারবে বলে আশা করা হচ্ছে।