বিশ্বজুড়ে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা বর্তমানে ক্রয়েৎজ (Kreutz) পরিবারের অন্তর্ভুক্ত ধূমকেতু সি/২০২৬ এ১ (ম্যাপস)-এর পেরিহেলিয়ন বা সূর্যের নিকটতম অবস্থানে পৌঁছানোর রোমাঞ্চকর মুহূর্তের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ২০২৬ সালের ৪ এপ্রিল এই মহাজাগতিক বস্তুটি সূর্যের ফটোস্ফিয়ারের মাত্র ১,৫৯,০০০ কিলোমিটারের মধ্যে চলে আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই যাত্রাপথে এটি সূর্যের করোনা অঞ্চলে প্রবেশ করবে, যেখানে তাপমাত্রা অবিশ্বাস্যভাবে ১০ লক্ষ ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও বেশি থাকে। হেনরিখ ক্রয়েৎজের নামানুসারে পরিচিত এই ধূমকেতু পরিবারটি ঐতিহাসিকভাবে অত্যন্ত উজ্জ্বল এবং প্রভাবশালী সব ধূমকেতুর জন্য পরিচিত, যার মধ্যে ১৮৪৩ সালের 'গ্রেট কমেট' এবং ১৯৬৫ সালের 'ইকেয়া-সেকি' ধূমকেতুর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
Suungrazer Comet C/2026 A1 (MAPS) continues to brighten steadily as it accelerates towards the Sun and its perihelion (closest approach) on April 4th. Photo via Gerald Rhemann & Michael Jäger "Yesterday evening, the comet passed over a 10mag star, which we removed before
২০২৬ সালের ১৩ জানুয়ারি চিলির সান পেড্রো ডি আটাকামায় অবস্থিত এএমএসিএস১ (AMACS1) মানমন্দিরের মাধ্যমে ফরাসি জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের একটি দক্ষ দল প্রথম এই ধূমকেতুটি শনাক্ত করেন। ম্যাপস (MAPS) কর্মসূচির অধীনে পরিচালিত এই বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানে দেখা যায়, আবিষ্কারের সময় বস্তুটির দৃশ্যমান উজ্জ্বলতা ছিল ১৮ ম্যাগনিটিউড এবং এটি সূর্য থেকে প্রায় ৩০৮ মিলিয়ন কিলোমিটার দূরে অবস্থান করছিল। পেরিহেলিয়নের ৮১ দিন আগে পৃথিবী থেকে ক্রয়েৎজ পরিবারের কোনো ধূমকেতু আবিষ্কারের ক্ষেত্রে এটি একটি অনন্য রেকর্ড হিসেবে গণ্য হচ্ছে। ২০২৬ সালের মার্চের মাঝামাঝি নাগাদ এর উজ্জ্বলতা নাটকীয়ভাবে প্রায় ৬০০ গুণ বৃদ্ধি পেয়ে ১০.৮ ম্যাগনিটিউডে পৌঁছেছে, যার ফলে ৮-১০ ইঞ্চির সাধারণ অপেশাদার টেলিস্কোপ দিয়েও মহাকাশপ্রেমীরা এটি পর্যবেক্ষণ করতে সক্ষম হচ্ছেন।
এই ধূমকেতুর সম্ভাব্য সর্বোচ্চ উজ্জ্বলতা নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে বর্তমানে বিভিন্ন ধরনের গাণিতিক মডেল ও মতভেদ কাজ করছে। একটি তাত্ত্বিক মডেল অনুযায়ী, এটি সর্বোচ্চ -১৬ ম্যাগনিটিউড পর্যন্ত উজ্জ্বলতা অর্জন করতে পারে, যা রাতের আকাশে পূর্ণিমার চাঁদের আলোর সাথে তুলনীয় হবে। অন্যদিকে, আরও কিছু রক্ষণশীল অনুমান বলছে যে এর উজ্জ্বলতা হয়তো -৫ ম্যাগনিটিউড পর্যন্ত পৌঁছাবে, যা অনেকটা উজ্জ্বল শুক্র গ্রহের মতো দেখাবে। সি/২০২৬ এ১ ধূমকেতুটির কক্ষপথের নতি প্রায় ১৪৪ ডিগ্রি, যা স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে যে এটি একটি বিশাল আদি ধূমকেতুর বিচ্ছিন্ন অংশ। জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মতে, সেই আদি ধূমকেতুটি সম্ভবত দুই হাজার বছরেরও বেশি সময় আগে ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গিয়েছিল। বর্তমানে মূল বৈজ্ঞানিক কৌতূহল হলো সূর্যের তীব্র তাপ ও প্রচণ্ড মহাকর্ষীয় বলের মুখে ধূমকেতুটির নিউক্লিয়াস বা কেন্দ্রটি কতটা দৃঢ়ভাবে টিকে থাকতে পারে।
বিভিন্ন বিশ্লেষণাত্মক মডেল ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, সূর্যের অত্যন্ত কাছ দিয়ে যাওয়ার সময় এই মহাজাগতিক বস্তুটি সম্পূর্ণভাবে ভেঙে যাওয়ার একটি প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। ক্রয়েৎজ পরিবারের ছোট সদস্যদের ক্ষেত্রে এটি একটি অত্যন্ত সাধারণ এবং স্বাভাবিক পরিণতি। তবে যদি এর কেন্দ্রটি যথেষ্ট বিশাল এবং শক্তিশালী হয়, তবে এটি ঘণ্টায় ১৫ লক্ষ কিলোমিটারেরও বেশি অবিশ্বাস্য গতিতে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে বেঁচে ফিরতে পারে এবং পৃথিবীর আকাশে এক অভূতপূর্ব দৃশ্যের অবতারণা করতে পারে। সূর্যের অত্যন্ত সন্নিকটে থাকায় সরাসরি খালি চোখে এটি দেখা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। এই কারণে বিজ্ঞানীরা এখন সোহো (SOHO) মহাকাশ মানমন্দিরের ল্যাসকো সি৩ (LASCO C3) যন্ত্রের মাধ্যমে সংগৃহীত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে দূরবর্তী পর্যবেক্ষণের কৌশল গ্রহণ করছেন।
ধূমকেতু সি/২০২৬ এ১ একটি বিপরীতমুখী বা রেট্রোগ্রেড কক্ষপথে পরিভ্রমণ করছে এবং এর কক্ষপথের পর্যায়কাল প্রায় ১৬৬০ বছর। এটি অন্যান্য পরিচিত ক্রয়েৎজ খণ্ডগুলোর তুলনায় (যাদের পর্যায়কাল সাধারণত ৭০০-৮০০ বছর) বেশ ভিন্ন। এই দীর্ঘ সময়কাল নির্দেশ করে যে, ম্যাপস সম্ভবত একটি 'দ্বিতীয় প্রজন্মের' খণ্ড, যা সম্ভবত ৩৬৩ খ্রিস্টাব্দে রোমান ঐতিহাসিক আমিয়ানাস মার্সেলিনাসের নথিবদ্ধ করা কোনো প্রাচীন ধূমকেতু থেকে উৎপন্ন হয়েছে। যদি ধূমকেতুটি পেরিহেলিয়ন অতিক্রমের পর তার উজ্জ্বলতা ও গঠন ধরে রাখতে পারে, তবে দক্ষিণ গোলার্ধের দেশগুলো থেকে এটি দেখার সবচেয়ে চমৎকার সুযোগ মিলবে। আশা করা হচ্ছে যে, ৫ থেকে ১৪ এপ্রিলের মধ্যে সন্ধ্যার গোধূলিলগ্নে পশ্চিম আকাশে এটি এক উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক হিসেবে দৃশ্যমান হবে।

