যুগল তারা ব্যাপক স্থানান্তর। আমাদের সূর্যের মতো তারা মিল্কি ওয়ের কেন্দ্রে থেকে ব্যাপক স্থানান্তর ঘটাচ্ছে, যা প্রায় ৪–৬ বিলিয়ন বছর আগে শুরু হয়েছে।
সাম্প্রতিক গবেষণায় এক চমকপ্রদ তথ্য সামনে এসেছে যে, সূর্য তার বর্তমান কক্ষপথে কোনো আকস্মিক ঘটনায় পৌঁছায়নি, বরং এটি ছিল নক্ষত্রদের এক সুসংগঠিত অভিপ্রয়াণের অংশ। বিজ্ঞানীদের মতে, এই মহাজাগতিক অভিযানের মাধ্যমেই সূর্য এবং তার সমগোত্রীয় নক্ষত্রগুলো মিল্কি ওয়ে গ্যালাক্সির অশান্ত কেন্দ্রস্থল থেকে তুলনামূলক শান্ত বাইরের সর্পিল বাহুগুলোতে সরে এসেছে। ২০২৬ সালের ১২ মার্চ 'অ্যাস্ট্রোনমি অ্যান্ড অ্যাস্ট্রোফিজিক্স' সাময়িকীতে এই গবেষণার ফলাফল আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত হয়।
এই যুগান্তকারী আবিষ্কারের মূলে ছিল ইউরোপীয় মহাকাশযান 'গাইয়া' (Gaia) থেকে প্রাপ্ত বিশাল জ্যোতির্মিতিক তথ্যভাণ্ডার, যার মূল বৈজ্ঞানিক কার্যক্রম ২০২৫ সালের শুরুর দিকে শেষ হয়েছিল। টোকিও মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক দাইসুকে তানিগুচি এবং জাপানের ন্যাশনাল অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল অবজারভেটরির অধ্যাপক তাকাজি সুজিমোতো এই গবেষণার নেতৃত্ব দেন। গবেষক দলটি ৬,৫৯৪টি নক্ষত্রের একটি ক্যাটালগ বিশ্লেষণ করেছেন, যেগুলোকে সূর্যের যমজ বা 'সোলার টুইন' হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই নক্ষত্রগুলোর তাপমাত্রা, পৃষ্ঠের মহাকর্ষ এবং রাসায়নিক গঠন সূর্যের সাথে হুবহু মিলে যায়। উল্লেখ্য যে, এই তথ্যভাণ্ডারটি আগের যেকোনো নমুনার তুলনায় প্রায় ৩০ গুণ বড়, যা গবেষণার ফলাফলকে অত্যন্ত শক্তিশালী ভিত্তি প্রদান করেছে।
বিশ্লেষণে দেখা গেছে যে, এই নক্ষত্রগুলোর বয়স চার থেকে ছয় বিলিয়ন বছরের মধ্যে, যা সূর্যের আনুমানিক বয়স ৪.৬ বিলিয়ন বছরের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল এই নক্ষত্রগুলো কীভাবে 'কোরোটেশন ব্যারিয়ার' বা সহ-আবর্তন বাধা অতিক্রম করল তা ব্যাখ্যা করা। এটি মূলত মিল্কি ওয়ের কেন্দ্রীয় দণ্ড বা 'বার' দ্বারা সৃষ্ট একটি মহাকর্ষীয় ফাঁদ। বিজ্ঞানীরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে, এই গণ-অভিপ্রয়াণটি গ্যালাক্সির বিবর্তনের প্রাথমিক পর্যায়ে ঘটেছিল। তখন কেন্দ্রীয় দণ্ডটি গঠন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল এবং এর মহাকর্ষীয় ক্ষেত্র স্থিতিশীল ছিল না, যা নক্ষত্রগুলোকে কেন্দ্র থেকে দূরে সরে যাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছিল।
ধারণা করা হচ্ছে, এই অভিপ্রয়াণের ফলে নক্ষত্রগুলো তাদের জন্মস্থান থেকে প্রায় ১০,০০০ আলোকবর্ষ দূরে সরে এসেছে। সূর্যের ধাতব গুণাগুণ (metallicity) বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায় যে, এর জন্ম হয়েছিল গ্যালাক্সির কেন্দ্রের অনেক কাছে। এই স্থানান্তরের একটি প্রধান তাৎপর্য হলো, সূর্যের এই শান্ত এবং কম ঘনত্বের বাইরের সর্পিল বাহুতে চলে আসা পৃথিবীর বুকে প্রাণের দীর্ঘমেয়াদী ও স্থিতিশীল বিবর্তনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এর বিপরীতে, গ্যালাক্সির অভ্যন্তরীণ অঞ্চলগুলো নক্ষত্রের উচ্চ ঘনত্ব এবং তীব্র তেজস্ক্রিয় বিকিরণে পূর্ণ থাকে, যা জটিল জৈবমণ্ডল বিকাশের জন্য একেবারেই অনুকূল নয়।
এই আবিষ্কারটি জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে মৌলিক গুরুত্ব বহন করে। এটি কেবল সূর্যের কক্ষপথ সংক্রান্ত দীর্ঘদিনের রহস্যই সমাধান করেনি, বরং আমাদের সৌরজগতের উৎপত্তির ইতিহাসকে গ্যালাক্সির সামগ্রিক গঠন ও বিবর্তনের সাথে যুক্ত করেছে। নক্ষত্রের জনতাত্ত্বিক তথ্য ব্যবহার করে গ্যালাকটিক বারের গঠনের সময়কাল নির্ধারণ করা 'গ্যালাকটিক আর্কিওলজি' বা ছায়াপথীয় প্রত্নতত্ত্বের একটি অনন্য উদাহরণ। এছাড়া, এই গবেষণাটি 'অ্যানথ্রপিক প্রিন্সিপল' বা মানবকেন্দ্রিক নীতির প্রেক্ষাপটও প্রদান করে। এটি ইঙ্গিত দেয় যে, পৃথিবীতে জটিল প্রাণের বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ আমাদের গ্যালাক্সির ইতিহাসের একটি নির্দিষ্ট এবং গতিশীল পর্যায়ের মাধ্যমেই সম্ভব হয়েছে।