অস্ট্রেলীয় গবেষকরা প্রথমবারের মতো দেখিয়েছেন যে, হার্ট অ্যাটাক বা মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশনের পর প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের হৃৎপিণ্ডে কার্ডিওমায়োসাইট—যা হৃদপিণ্ডের প্রধান পেশি কোষ—সেগুলোর বিভাজন শুরু হয়। এই আবিষ্কার প্রাপ্তবয়স্কদের হৃৎপিণ্ডের পুনর্গঠন ক্ষমতা নেই বলে প্রচলিত ধারণাকে বদলে দিয়েছে এবং হৃদপেশির প্রাকৃতিক নিরাময় ক্ষমতা বাড়াতে পারে এমন নতুন চিকিৎসা পদ্ধতি উদ্ভাবনের একটি বাস্তব, যদিও প্রাথমিক পথ খুলে দিয়েছে।
বিশ্বজুড়ে মৃত্যুর প্রধান কারণ হিসেবে এখনো মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশন বা হার্ট অ্যাটাক শীর্ষস্থানে রয়েছে। এর ফলে মানুষের হৃদপিণ্ডের প্রায় তিনশ কোটি কার্ডিওমায়োসাইটের এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত ধ্বংস হতে পারে। দীর্ঘকাল ধরে ধারণা করা হতো যে, প্রাপ্তবয়স্ক কার্ডিওমায়োসাইটগুলো প্রায় কখনই বিভাজিত হয় না এবং মৃত কোষগুলোর স্থান স্কার টিস্যু বা ক্ষতচিহ্ন দখল করে নেয়, যা হৃদপিণ্ডের রক্ত পাম্প করার ক্ষমতা কমিয়ে দেয় এবং হার্ট ফেইলিয়রের দিকে ঠেলে দেয়।
২০২৬ সালের জানুয়ারিতে সার্কুলেশন রিসার্চ (Circulation Research) জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় (DOI: 10.1161/CIRCRESAHA.125.327486) প্রথমবারের মতো মানুষের ক্ষেত্রে এর বিপরীত প্রমাণ পাওয়া গেছে। ডক্টর রবার্ট হিউম (সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়, চার্লস পারকিন্স সেন্টার, বেয়ার্ড ইনস্টিটিউট) এবং অধ্যাপক শন লালের (সিডনি বিশ্ববিদ্যালয় এবং রয়্যাল প্রিন্স আলফ্রেড হাসপাতাল) নেতৃত্বে এই গবেষক দলটি রোগীদের করোনারি আর্টারি বাইপাস সার্জারির সময় সংগ্রহ করা হৃৎপিণ্ডের টিস্যুর অনন্য জীবন্ত নমুনা ব্যবহার করেছেন।
নমুনাগুলো হৃদপিণ্ডের ক্ষতিগ্রস্ত এবং অপেক্ষাকৃত সুস্থ উভয় অংশ থেকেই সংগ্রহ করা হয়েছিল। বিজ্ঞানীরা মাইটোসিস ও সাইটোকাইনেসিস মার্কারের ইমিউনোফ্লুরোসেন্স স্টেনিং, বাল্ক এবং সিঙ্গেল-নিউক্লিয়াস আরএনএ সিকোয়েন্সিং, প্রোটিওমিক্স, মেটাবোলোমিক্স প্রয়োগ করেছেন এবং সেই সাথে মানুষের হার্ট অ্যাটাক সংক্রান্ত উপলব্ধ বৃহত্তম snRNA-seq ডেটাসেট বিশ্লেষণ করেছেন। ফলাফলগুলো অত্যন্ত স্পষ্ট: মানুষের হৃদপিণ্ডের ভেন্ট্রিকুলার কার্ডিওমায়োসাইটগুলো প্রকৃতপক্ষে রক্তাল্পতা বা ইশেমিয়ার প্রতিক্রিয়ায় মাইটোটিক কার্যকলাপ বৃদ্ধি করে এবং কোষ বিভাজন (সাইটোকাইনেসিস) সম্পন্ন করে।
এর আগে ইঁদুরের ওপর গবেষণায় হার্ট অ্যাটাকের এই প্রতিক্রিয়াটি বিশদভাবে বর্ণনা করা হলেও, মানুষের ক্ষেত্রে এর কোনো সরাসরি প্রমাণ ছিল না। এখন সেই প্রমাণ পাওয়া গেছে—এবং তা কেবল মৃতদেহ থেকে নয়, বরং মানুষের জীবন্ত টিস্যু থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে।
রোগীদের জন্য এটি বেশ কয়েকটি কারণে গুরুত্বপূর্ণ। হার্ট অ্যাটাকের পর হার্ট ফেইলিয়র একটি ব্যাপক সমস্যা: শুধুমাত্র অস্ট্রেলিয়াতেই প্রায় 144,000 মানুষ এই রোগ নিয়ে বেঁচে আছেন, অথচ প্রতি বছর মাত্র 115টির মতো হার্ট ট্রান্সপ্লান্ট করা হয়। যদি কোনোভাবে হৃদপিণ্ডে বিদ্যমান এই প্রক্রিয়াটিকে ঔষধের মাধ্যমে শক্তিশালী করা সম্ভব হয়, তবে হার্ট ট্রান্সপ্লান্টের মতো চরম ব্যবস্থা ছাড়াই হার্ট ফেইলিয়র ধীর করা বা আংশিকভাবে নিরাময়ের সম্ভাবনা তৈরি হবে। গবেষকরা ইতিমধ্যে এই প্রক্রিয়ায় জড়িত বেশ কিছু প্রোটিন শনাক্ত করেছেন (যা আগে ইঁদুরের ওপর গবেষণায় জানা গিয়েছিল), যেগুলো এখন সরাসরি মানুষের নমুনার ওপর পরীক্ষা করা সম্ভব।
তবে এই ফলাফলের গুরুত্বকে এখনই খুব বেশি অতিরঞ্জিত করা ঠিক হবে না। কোষে মাইটোসিস বা বিভাজন বৃদ্ধি পেলেও এর মাত্রা সম্ভবত বেশ কম এবং এটি এখনো বড় ধরনের হার্ট অ্যাটাকের ফলে হওয়া কোষের ক্ষতি পুরোপুরি পুষিয়ে নিতে সক্ষম নয়। এই গবেষণাটি এখনই কোনো তৈরি চিকিৎসা পদ্ধতি দিচ্ছে না—এটি কেবল হৃদপিণ্ডের নিজস্ব পুনর্গঠন প্রতিক্রিয়ার অস্তিত্ব প্রমাণ করে এবং পরবর্তী গবেষণার জন্য একটি ভিত্তি তৈরি করে। নির্দিষ্ট রোগীদের ক্ষেত্রে এই প্রক্রিয়াটি কতটা নিরাপদ এবং নিয়ন্ত্রিত উপায়ে বৃদ্ধি করা সম্ভব এবং এর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব কী হতে পারে, তা এখনো অজানা।
পরবর্তী পদক্ষেপ কী? হৃদপিণ্ডের পুনর্ুৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধির উপায় খুঁজে বের করার উদ্দেশ্যে এই গবেষক দলটি ইতিমধ্যেই জীবন্ত হার্ট টিস্যু সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের পদ্ধতি তৈরি করছে। পরের ধাপগুলো হলো শনাক্ত করা নিয়ন্ত্রক প্রোটিনগুলোর আরও গভীর আণবিক বিশ্লেষণ, মানুষের টিস্যু মডেলে সম্ভাব্য অণুগুলোর কার্যকারিতা পরীক্ষা এবং ভবিষ্যতে প্রি-ক্লিনিক্যাল ও ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল পরিচালনা করা। বিজ্ঞানের সামনে এখন প্রধান প্রশ্ন হলো: নতুন কোনো ঝুঁকি তৈরি না করেই আমরা হৃদপিণ্ডকে তার নিজস্ব নিরাময় প্রক্রিয়ায় কতটা শক্তিশালী এবং সুনির্দিষ্টভাবে উৎসাহিত করতে পারব।
এই গবেষণাটি অলৌকিক কোনো প্রতিশ্রুতি নয়, বরং এটি একটি নির্ভুল এবং গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক প্রমাণ: প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের হৃৎপিণ্ড পেশি পুনর্গঠনের সক্ষমতা থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন নয়। সীমিত পরিসরে হলেও হৃদপিণ্ডের নিজস্ব মেরামতের সরঞ্জাম রয়েছে। এখন চিকিৎসাবিজ্ঞানের লক্ষ্য হলো এই শক্তিকে দক্ষতার সাথে ব্যবহার করতে শেখা।




