পৃথিবী ও সূর্যের সারিবদ্ধতায় আন্তঃনাক্ষত্রিক ধূমকেতু 3I/ATLAS-এর উজ্জ্বলতা বৃদ্ধি পেল: হাবল টেলিস্কোপের পর্যবেক্ষণ

সম্পাদনা করেছেন: Uliana S.

3I/ATLAS-এর সূর্য-পৃথিবী অক্ষের সঙ্গে তার দুর্লভ সমান্তররণের সময় Hubble-এর ছবিগুলো, 22 জানুয়ারি 2026.

২০২৬ সালের ২২ জানুয়ারি মহাকাশ বিজ্ঞানের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এই দিনে মহাকাশ টেলিস্কোপ 'হাবল' আন্তঃনাক্ষত্রিক বস্তু 3I/ATLAS-এর উজ্জ্বলতায় এক অভাবনীয় বৃদ্ধি লক্ষ্য করেছে। পৃথিবী, সূর্য এবং ধূমকেতুটি প্রায় নিখুঁতভাবে এক সারিতে চলে আসার ফলে এই বিরল ঘটনাটি ঘটে। জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মতে, এই সারিবদ্ধতার সময় বিচ্যুতি কোণ ছিল মাত্র ০.০১২ রেডিয়ান, যাকে তারা ধূমকেতুটির 'পূর্ণিমা দশা' বা 'ফুল মুন ফেজ' হিসেবে অভিহিত করেছেন। হাবল টেলিস্কোপটি ইউটিসি (UTC) ১৩:১০:৩০ থেকে ১৩:৪৩:৩৩ সময়ের মধ্যে ছয়টি ভিন্ন ভিন্ন এক্সপোজারের মাধ্যমে এই দৃশ্যটি ধারণ করে।

এই বিরল মহাজাগতিক সংযোগের ফলে ধূমকেতুটির চারপাশে একটি উজ্জ্বল আলোকবলয় বা 'হ্যালো' তৈরি হয়। সূর্যের দিকে প্রসারিত এই বলয়টির দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ১,০০,০০০ কিলোমিটার, যা পৃথিবীর ব্যাসের প্রায় দশ গুণের সমান। এই সারিবদ্ধতার সময় সংগৃহীত তথ্যগুলো এই বহিঃসৌরজাগতিক আগন্তুকের ভৌত প্রকৃতি বোঝার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উজ্জ্বলতা বৃদ্ধির মাত্রা এবং এর গতি সরাসরি ধূমকেতু থেকে নির্গত কণাগুলোর গঠনগত বৈশিষ্ট্য এবং উপাদানের ওপর নির্ভর করে।

প্রখ্যাত জ্যোতির্পদার্থবিদ আভি লোয়েব এবং মাউরো বার্বিয়েরি এই ঘটনার গুরুত্ব ব্যাখ্যা করেছেন। তারা জানান যে, পৃথিবী যখন সূর্যের দিক থেকে কোনো বস্তুকে পর্যবেক্ষণ করে, তখন ধূলিকণার প্রতিফলিত পৃষ্ঠগুলো সবচেয়ে স্পষ্টভাবে দেখা যায়। ধূমকেতুটির 'অ্যান্টি-টেইল' বা বিপরীত লেজটি পৃথিবীর দিকে মুখ করে থাকায় এর থেকে নির্গত খণ্ডগুলোর গঠন ও আকার সম্পর্কে মূল্যবান তথ্য পাওয়া সম্ভব হয়েছে। ঘূর্ণায়মান গ্রেডিয়েন্ট ফিল্টার ব্যবহার করে ছবিগুলো বিশ্লেষণ করার পর চারটি জেট বা গ্যাসীয় প্রবাহের উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে একটি প্রধান অ্যান্টি-টেইল সূর্য ও পৃথিবীর দিকে নির্দেশিত ছিল এবং বাকি তিনটি মিনি-জেট একে অপরের থেকে ১২০ ডিগ্রি কোণে বিন্যস্ত ছিল।

১আই/ওউমুয়ামুয়া (1I/ʻOumuamua) এবং ২আই/বরিসভ (2I/Borisov)-এর পর ৩আই/অ্যাটলাস (3I/ATLAS) হলো সৌরজগতে আসা তৃতীয় নিশ্চিত আন্তঃনাক্ষত্রিক বস্তু। চিলির রিও হুরতাডোতে অবস্থিত অ্যাটলাস (ATLAS) টেলিস্কোপ সিস্টেমের মাধ্যমে ২০২৫ সালের ১ জুলাই এটি প্রথম আবিষ্কৃত হয়। এই ধূমকেতুটির কক্ষপথের উৎকেন্দ্রিকতা বা এক্সেন্ট্রিসিটি ৬.১৩৯, যা আগের আন্তঃনাক্ষত্রিক বস্তুগুলোর তুলনায় অনেক বেশি। বিজ্ঞানীদের ধারণা, ৩আই/অ্যাটলাস আমাদের সূর্যের চেয়েও প্রাচীন হতে পারে, যার বয়স ৪.৬ বিলিয়ন বছর। এটি নির্দেশ করে যে বস্তুটি মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির অনেক পুরনো কোনো অঞ্চল থেকে উদ্ভূত হয়েছে।

বর্তমানে ধূমকেতুটি একটি হাইপারবোলিক পথে সৌরজগত থেকে বাইরের দিকে ধাবিত হচ্ছে এবং বিজ্ঞানীরা নিরবচ্ছিন্নভাবে এর তথ্য বিশ্লেষণ করে চলেছেন। ২০২৬ সালের ১৬ মার্চ এটি বৃহস্পতি গ্রহের পাশ দিয়ে অতিক্রম করবে। সেই সময় ধূমকেতুটি বৃহস্পতি থেকে ০.৩৫৮৩৫ জ্যোতির্বিদ্যা একক (AU) বা প্রায় ৫৩.৬১ মিলিয়ন কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থান করবে। এই পরিকল্পিত ফ্লাইবাই বা নিকটবর্তী অবস্থান বিজ্ঞানীদের জন্য আরও নতুন তথ্য সংগ্রহের একটি সুবর্ণ সুযোগ তৈরি করবে।

এই আন্তঃনাক্ষত্রিক পরিব্রাজকের যাত্রা আমাদের মহাবিশ্বের অজানা রহস্যগুলো উন্মোচনে সাহায্য করছে। হাবল টেলিস্কোপের এই পর্যবেক্ষণগুলো কেবল একটি ধূমকেতুর উজ্জ্বলতা বৃদ্ধি নয়, বরং আমাদের সৌরজগতের বাইরের জগত সম্পর্কে গভীর জ্ঞান অর্জনের পথ প্রশস্ত করেছে। ৩আই/অ্যাটলাস-এর মতো বস্তুগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে মহাকাশ কত বিশাল এবং এর প্রতিটি কোণ থেকে আসা সংকেতগুলো বিজ্ঞানের জন্য কতটা মূল্যবান।

34 দৃশ্য

উৎসসমূহ

  • smithamevents.com.au

  • SURF Lab

  • YouTube

  • Wikipedia

  • NASA Science

  • Medium

আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।