২০২২ সালে NASA-র DART মিশন Dimorphos নামে ছোট একটি অ্যাস্টরয়েডের সঙ্গে সংঘর্ষ করে বিপজ্জনক একটি অ্যাস্টরয়েডকে বিচ্যুত করার একটি পদ্ধতি পরীক্ষা করেছে।
ইউনিভার্সিটি অফ মেরিল্যান্ডের (UMD) সাম্প্রতিক গবেষণা মহাকাশ সম্পর্কে আমাদের প্রচলিত ধারণা বদলে দিচ্ছে। সাধারণত মহাকাশকে একটি স্থির পরিবেশ মনে করা হলেও, এই গবেষণায় দেখা গেছে যে দ্বৈত বা বাইনারি গ্রহাণু ব্যবস্থাগুলো অত্যন্ত গতিশীল। পৃথিবীর নিকটবর্তী মহাকাশীয় বস্তুগুলোর প্রায় ১৫ শতাংশই এই ধরনের দ্বৈত ব্যবস্থা। ২০২৬ সালের ৬ মার্চ 'দ্য প্ল্যানেটারি সায়েন্স জার্নাল'-এ প্রকাশিত এই গবেষণায় বলা হয়েছে যে, এই গ্রহাণুগুলোর মধ্যে কেবল মহাকর্ষীয় ভারসাম্যই কাজ করে না, বরং তারা একে অপরের সাথে ধূলিকণা এবং পাথরের টুকরো বিনিময় করে। নিম্ন গতির সংঘর্ষের মাধ্যমে ঘটা এই প্রক্রিয়াটি গ্রহাণুগুলোর উপরিভাগকে ক্রমাগত পরিবর্তিত করছে।
এই গবেষণার মূল প্রমাণগুলো এসেছে ২০২২ সালে নাসার (NASA) ডার্ট (DART) মিশনের ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ থেকে। ডিমরফস গ্রহাণুতে আঘাত হানার ঠিক আগ মুহূর্তে ধারণ করা এই ভিডিওগুলো বিশ্লেষণ করেছেন অধ্যাপক জেসিকা সানশাইন এবং তার সহকর্মীরা। তারা ডিমরফসের পৃষ্ঠে উজ্জ্বল পাখা আকৃতির দাগ বা রেখা খুঁজে পেয়েছেন। টনি ফার্নহ্যাম এবং হুয়ান রিসোসের তৈরি বিশেষ অ্যালগরিদম ব্যবহার করে আলোক বিভ্রম দূর করার পর নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, এগুলো আসলে বিশাল গ্রহাণু ডিডিমস থেকে তার উপগ্রহ ডিমরফসে পদার্থের স্থানান্তরের চিহ্ন। অধ্যাপক সানশাইন এই প্রক্রিয়াটিকে 'মহাজাগতিক তুষারপাত' হিসেবে বর্ণনা করেছেন। প্রতি সেকেন্ডে মাত্র ৩০.৭ সেন্টিমিটার বেগে এই সংঘর্ষগুলো ঘটে বলে সেখানে কোনো বড় গর্ত তৈরি হয়নি, বরং আঘাতের চিহ্ন বা 'স্কার' তৈরি হয়েছে।
এই বিশ্লেষণটি ইয়ারকভস্কি-ও'কিফ-রাডজিভস্কি-প্যাড্যাক (YORP) প্রভাবের প্রথম সরাসরি চাক্ষুষ প্রমাণ প্রদান করেছে। সূর্যের তাপের কারণে ডিডিমস গ্রহাণুটি দ্রুত ঘুরতে থাকে, যার ফলে এর উপরিভাগ থেকে পদার্থ ছিটকে বেরিয়ে আসে। ইউএমডি-র গবেষক হ্যারিসন অ্যাগ্রুসা একটি ত্রিমাত্রিক মডেল তৈরি করে দেখিয়েছেন যে, এই ধ্বংসাবশেষগুলো মূলত ডিমরফসের বিষুবীয় অঞ্চলে জমা হয়। ইউএমডি-র ইনস্টিটিউট ফর ফিজিক্যাল সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজিতে এস্তেবান রাইটের দল নুড়ি এবং বালু ব্যবহার করে এই প্রক্রিয়ার সিমুলেশন করেছেন, যা পাখা আকৃতির রেখা তৈরির বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। লিভারমোর ন্যাশনাল ল্যাবরেটরিতে কম্পিউটার মডেলিংয়ের মাধ্যমে এই ফলাফলগুলো যাচাই করা হয়েছে।
গ্রহ সুরক্ষার ক্ষেত্রে এই আবিষ্কারের গুরুত্ব অপরিসীম, কারণ এখন থেকে দ্বৈত গ্রহাণু ব্যবস্থার এই ধীর কিন্তু নিরবচ্ছিন্ন ভর বিনিময় প্রক্রিয়াটিকে বিবেচনায় নিতে হবে। ২০২৬ সালের ৬ মার্চ 'সায়েন্স অ্যাডভান্সেস' জার্নালে প্রকাশিত অন্য একটি নিবন্ধে জানানো হয়েছে যে, ডার্টের আঘাত ডিডিমস-ডিমরফস ব্যবস্থার সূর্যকে কেন্দ্র করে আবর্তনের কক্ষপথকে ৭৭০ দিনের চক্রে ০.১৫ সেকেন্ড সরিয়ে দিয়েছে। এটি মানব ইতিহাসের প্রথম ঘটনা যেখানে মানুষের কোনো কর্মকাণ্ড একটি মহাকাশীয় বস্তুর সূর্যকেন্দ্রিক গতিপথ পরিবর্তন করেছে। আঘাতের ফলে ছিটকে আসা ধ্বংসাবশেষ এই পরিবর্তনের গতিবেগকে প্রায় দ্বিগুণ করে দিয়েছিল।
এই ঘটনাটি আরও বিস্তারিতভাবে পর্যবেক্ষণের জন্য ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থা (ESA) 'হেরা' (Hera) নামক একটি মিশন পাঠিয়েছে। ২০২৪ সালের ৭ অক্টোবর কেপ ক্যানাভেরাল থেকে ফ্যালকন ৯ রকেটের সাহায্যে এটি উৎক্ষেপণ করা হয়। ইএসএ-র মহাকাশ সুরক্ষা কর্মসূচির অংশ হিসেবে হেরা মিশনটি ২০২৬ সালের নভেম্বরে ডিডিমস সিস্টেমে পৌঁছাবে। সেখানে এটি আঘাত-পরবর্তী ভূ-তাত্ত্বিক জরিপ চালাবে, যা ডার্টের পরীক্ষাকে পৃথিবীর সুরক্ষার জন্য একটি নির্ভরযোগ্য পদ্ধতিতে পরিণত করবে। ডিডিমস (৬৫৮০৩) গ্রহাণুটির ব্যাস প্রায় ৭৮০ মিটার এবং এর উপগ্রহ ডিমরফস ১৫১ মিটার চওড়া, যা গিজার গ্রেট পিরামিডের আকারের সাথে তুলনীয়। যেহেতু এই সিস্টেমটি পৃথিবীর জন্য কোনো হুমকি নয়, তাই এটি কক্ষপথ পরিবর্তনের পরীক্ষার জন্য আদর্শ ছিল।