কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা মানুষ এবং গোল্ডেন রিট্রিভার কুকুরের মধ্যে আবেগজনিত ও আচরণগত বৈশিষ্ট্যের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য জিনগত সাদৃশ্য খুঁজে পেয়েছেন। 'প্রোসিডিংস অফ দ্য ন্যাশনাল একাডেমি অফ সায়েন্সেস' (Proceedings of the National Academy of Sciences) জার্নালে প্রকাশিত এই গবেষণায় প্রথমবারের মতো প্রমাণিত হলো যে, কুকুরের আচরণ নিয়ন্ত্রণকারী নির্দিষ্ট কিছু জিন মানুষের মধ্যে উদ্বেগ, বিষণ্নতা প্রবণতা এবং বুদ্ধিমত্তার মাত্রার সাথে সম্পর্কযুক্ত। এটি একটি যুগান্তকারী আবিষ্কার যা প্রাণী ও মানুষের মানসিকতার গভীর সংযোগ উন্মোচন করে।
গবেষণা দলটি মোট ১৩০০ গোল্ডেন রিট্রিভারের জেনেটিক উপাদান বিশ্লেষণ করে। এই বিশ্লেষণের সঙ্গে কুকুরের মালিকদের কাছ থেকে বিস্তারিত প্রশ্নাবলীর মাধ্যমে সংগৃহীত আচরণগত মূল্যায়নগুলিকে মেলানো হয়েছিল। ২০১২ সালে মরিস অ্যানিমেল ফাউন্ডেশনের অর্থায়নে শুরু হওয়া 'গোল্ডেন রিট্রিভার লাইফটাইম স্টাডি' প্রকল্পের অধীনে এই তথ্য সংগ্রহ করা হয়। এই প্রকল্পের অংশ হিসেবে প্রতি বছর কুকুরগুলির আচরণ সংক্রান্ত ৭৩টি ভিন্ন বৈশিষ্ট্য নিয়ে প্রশ্নপত্র পূরণ করা হতো, যা ১৪টি প্রধান শ্রেণীতে বিভক্ত ছিল। এই ব্যাপক তথ্যভান্ডার বিভিন্ন চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য নির্ভুলভাবে ভবিষ্যদ্বাণী করতে সাহায্য করেছে।
জিনোম-ব্যাপী অ্যাসোসিয়েশন অনুসন্ধানের (Genome-Wide Association Study) ফলস্বরূপ, বিজ্ঞানীরা বারোটি জিনের সন্ধান পান যা সরাসরি কুকুরের আচরণগত বিন্যাসের সঙ্গে সম্পর্কিত। এই বৈশিষ্ট্যগুলির মধ্যে রয়েছে শেখার ক্ষমতা, শক্তির মাত্রা, অপরিচিত বস্তুর প্রতি ভয় এবং আগ্রাসন। মানুষের জিনোমের তথ্যের সঙ্গে তুলনামূলক বিশ্লেষণে দেখা যায় যে, এই বারোটি কুকুরের জিন মানুষের আবেগিক অবস্থা এবং আচরণগত বৈশিষ্ট্যের ভিত্তি হিসেবেও কাজ করে। গবেষণার প্রধান ডক্টর এলেনর রাফফ্যান জোর দিয়ে বলেছেন যে এই ফলাফলগুলি জোরালোভাবে প্রমাণ করে যে উভয় প্রজাতির আচরণের জন্য সাধারণ জিনগত ভিত্তি বিদ্যমান।
বিশেষ মনোযোগ আকর্ষণ করেছে PTPN1 জিনটি। গোল্ডেন রিট্রিভারদের মধ্যে এই জিনটি অন্য কুকুরের প্রতি আগ্রাসনের সঙ্গে যুক্ত, অন্যদিকে মানুষের ক্ষেত্রে এটি উচ্চ বুদ্ধিমত্তা এবং একইসাথে বিষণ্নতা রোগের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত। অন্য একটি চিহ্নিত মার্কার, যা রিট্রিভারদের মধ্যে 'অসামাজিক ভয়' (যেমন ভ্যাকুয়াম ক্লিনারের প্রতি ভয়) সৃষ্টি করে, তা মানুষের মধ্যে বর্ধিত সংবেদনশীলতা এবং খিটখিটে মেজাজের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। গবেষণার প্রথম লেখক, ডক্টরেট গবেষক এনোচ আলেক্স, এবং অন্যান্য গবেষকরা এই বিষয়টি তুলে ধরেন যে জিনগত কারণই আচরণের চালক। এর ফলে কিছু কুকুর সহজেই মানসিক চাপে ভোগে, যা ভুলবশত 'খারাপ অভ্যাস' হিসেবে গণ্য হতে পারে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার হলো ROMO1 জিনের ভূমিকা, যা গোল্ডেন রিট্রিভারদের শেখার ক্ষমতা নির্ধারণ করে। মানুষের ক্ষেত্রে, এই একই জিন বুদ্ধিমত্তার মাত্রা এবং আবেগিক সংবেদনশীলতার সঙ্গে যুক্ত। এই পর্যবেক্ষণ এই ধারণাকে সমর্থন করে যে পোষা প্রাণীর প্রশিক্ষণের সময় তাদের মানসিক অবস্থাকে বিবেচনা করা জরুরি। রিট্রিভারদের মধ্যেকার ভীরুতা এবং মানুষের মধ্যেকার উদ্বেগের মতো বৈশিষ্ট্যের জিনগত ভিত্তি বোঝার মাধ্যমে পশুচিকিৎসা বিজ্ঞানে ঔষধ প্রয়োগের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হতে পারে। অধ্যাপক ড্যানিয়েল মিলস উল্লেখ করেছেন যে শুধুমাত্র একটি নির্দিষ্ট প্রজাতির ওপর মনোযোগ দেওয়ায় জেনেটিক 'গোলমাল' এড়ানো সম্ভব হয়েছে, যা কুকুরদের মানুষের মানসিক অবস্থা অধ্যয়নের জন্য একটি আদর্শ মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে।




