২০২৬ সালের মধ্যে ৪ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ: এআই ডেটা সেন্টারের নতুন আঞ্চলিক হাবে পরিণত হচ্ছে হো চি মিন সিটি

সম্পাদনা করেছেন: Svetlana Velgush

আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) বর্তমানে ভিয়েতনামের ডেটা সেন্টার এবং রিয়েল এস্টেট বাজারে এক অভূতপূর্ব বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে আসছে। বিশেষ করে দেশটির বাণিজ্যিক রাজধানী হো চি মিন সিটি (HCMC) এখন এই খাতের আন্তর্জাতিক পুঁজি বিনিয়োগের প্রধান কৌশলগত কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। শহরটিতে বর্তমানে হাইপারস্কেল ডেটা সেন্টার এবং কোলোকেশন পরিষেবার ক্ষেত্রে রেকর্ড পরিমাণ বিনিয়োগের জোয়ার দেখা যাচ্ছে। এই ক্রমবর্ধমান অবকাঠামোগত তৎপরতার মূল চালিকাশক্তি হলো ভিয়েতনামের অভ্যন্তরীণ বাজারে দ্রুতগতিতে এআই প্রযুক্তির প্রসার এবং ক্লাউড কম্পিউটিং সেবার ক্রমবর্ধমান চাহিদা। যদিও ভিয়েতনামের বর্তমান ডেটা সেন্টার সক্ষমতা চীনের মতো আঞ্চলিক পরাশক্তিদের তুলনায় কিছুটা কম, তবুও এই বিশাল অবকাঠামোগত উন্নয়ন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ডিজিটাল অর্থনীতিতে দেশটির ক্রমবর্ধমান গুরুত্বকে স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তুলছে।

এই বিনিয়োগের জোয়ারে সবচেয়ে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করছে G42/Microsoft, FPT Corporation, VinaCapital এবং Viet Thai Group-এর সমন্বয়ে গঠিত একটি শক্তিশালী কনসোর্টিয়াম। তারা প্রায় ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয়ে একটি বিশাল 'এআই ফ্যাক্টরি' বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কারখানা নির্মাণের এক উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। তান ফু ট্রুং (Tan Phu Trung) শিল্প পার্কে ১০ হেক্টর জায়গা জুড়ে বিস্তৃত এই কমপ্লেক্সটি এশিয়া এবং বিশ্বজুড়ে ক্লাউড পরিষেবার জন্য অত্যাধুনিক অবকাঠামো এবং সমন্বিত এআই সমাধান প্রদানের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এই বিশাল বিনিয়োগের গুরুত্ব এবং এর অর্থনৈতিক প্রভাব বিবেচনা করে, হো চি মিন সিটি পিপলস কমিটি ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের শেষের দিকে একটি বিশেষ আন্তঃবিভাগীয় ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন করেছে। এই গ্রুপের প্রধান দায়িত্ব হলো আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করা এবং প্রকল্পের নির্মাণ কাজ দ্রুত সম্পন্ন করতে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক সহায়তা প্রদান করা।

G42-এর এই ফ্ল্যাগশিপ প্রকল্পের পাশাপাশি তান ফু ট্রুং শিল্প পার্কে আরও একটি বড় ধরনের বিনিয়োগের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়েছে। AIC, KBC এবং VietinBank-এর সমন্বয়ে গঠিত একটি কনসোর্টিয়াম ২.০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগে ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি বিশাল ডেটা সেন্টার কমপ্লেক্স নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে। সমান্তরালভাবে, ভিয়েতনামের শীর্ষস্থানীয় টেলিকম প্রতিষ্ঠান ভিয়েটেল গ্রুপ (Viettel Group) ২০২৫ সালের এপ্রিলে নিজস্ব উচ্চ-প্রযুক্তি সম্পন্ন ডেটা সেন্টারের নির্মাণ কাজ শুরু করেছে। ১৪০ মেগাওয়াট পর্যন্ত ক্ষমতাসম্পন্ন এই গবেষণা ও উন্নয়ন কেন্দ্রের প্রথম পর্যায়ের কাজ ২০২৬ সালের শুরুতেই সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়া সিএমসি টেকনোলজি গ্রুপ (CMC Technology Group) সাইগন হাই-টেক পার্কে (SHTP) তাদের হাইপারস্কেল প্রকল্পে বড় ধরনের বিনিয়োগ করছে। সিএমসি হাইপারস্কেল ডিসি (CMC Hyperscale DC) নামের এই প্রকল্পটির প্রাথমিক ক্ষমতা ৩০ মেগাওয়াট হলেও পরবর্তীতে তা ১২০ মেগাওয়াটে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে, যার নির্মাণ কাজ ২০২৬ সালে শুরু হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

ভিয়েতনামের এই উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনার পেছনে শক্তিশালী অর্থনৈতিক সূচকগুলো কাজ করছে। ধারণা করা হচ্ছে, ২০২৬ সালের মধ্যে ভিয়েতনামের মোট ডেটা সেন্টার সক্ষমতা প্রায় ১০৪ মেগাওয়াটে পৌঁছাবে, যা চীনের মতো শীর্ষ বাজারের তুলনায় প্রায় দশ ভাগের এক ভাগ মাত্র। তবে ভিয়েতনামে ডেটা সেন্টার নির্মাণের গড় খরচ প্রতি ওয়াটে মাত্র ৭ ডলারের কাছাকাছি, যা সমগ্র এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের মধ্যে অন্যতম সর্বনিম্ন এবং এটি আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি বড় আকর্ষণ। সিবিআরই ভিয়েতনাম (CBRE Vietnam)-এর বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দ্রুত ডিজিটাল রূপান্তর এবং ক্লাউড পরিষেবার ক্রমবর্ধমান চাহিদাই এই বিনিয়োগের প্রবণতাকে ত্বরান্বিত করছে। অন্যদিকে, জেএলএল ভিয়েতনাম (JLL Vietnam)-এর সিইও ট্রাং লে (Trang Le) উল্লেখ করেছেন যে, সরকারের কৌশলগত বিদ্যুৎ পরিকল্পনা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের সুযোগ এই বাজারকে দীর্ঘমেয়াদে আরও শক্তিশালী ও টেকসই করে তুলছে।

আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান G42 মাইক্রোসফটের কাছ থেকে বড় ধরনের বিনিয়োগ পাওয়ার পর ভিয়েতনামের বাজারে নিজেদের অবস্থান সুসংহত করতে অত্যন্ত আগ্রহী। ভিয়েতনামের নীতিনির্ধারকরা এখন আন্তর্জাতিক ব্যবসায়িক মডেলের এই প্রকল্পগুলোর জন্য সিঙ্গাপুরের আদলে বিশেষ রেগুলেটরি ফ্রেমওয়ার্ক বা আইনি কাঠামো প্রবর্তনের কথা গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করছেন। এটি বিদ্যমান আইনি অসঙ্গতি দূর করতে এবং বিশ্বব্যাপী ডেটা সিস্টেমের সাথে নিরবচ্ছিন্ন সংযোগ নিশ্চিত করতে অত্যন্ত জরুরি, যা আন্তর্জাতিক ক্লাউড পরিষেবা গ্রাহকদের অন্যতম প্রধান শর্ত। এভাবেই হো চি মিন সিটি বহু বিলিয়ন ডলারের বিদেশি বিনিয়োগ এবং সরকারের সক্রিয় সহযোগিতার ওপর ভিত্তি করে নিজেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি প্রধান প্রযুক্তিগত হাবে পরিণত করার পথে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে।

28 দৃশ্য

উৎসসমূহ

  • vietnam.vnanet.vn

  • The Tech Capital

  • Vietnam Plus

  • Vietnam News

  • Market Research Report

  • W.Media

আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।