২০২৬ সালের ১৭ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হলো হাই সিজ ট্রিটি বা উচ্চ সমুদ্র চুক্তি: সমুদ্র সুরক্ষায় এক বৈশ্বিক মাইলফলক
সম্পাদনা করেছেন: Svetlana Velgush
২০২৬ সালের ১৭ জানুয়ারি তারিখটি বিশ্ব পরিবেশ রক্ষার ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। এই দিনে জাতিসংঘের 'ন্যাশনাল জুরিসডিকশন বহির্ভূত জীববৈচিত্র্য চুক্তি' বা বিবিএনজে (BBNJ) চুক্তি, যা সর্বজনবিদিতভাবে 'হাই সিজ ট্রিটি' নামে পরিচিত, আইনগতভাবে কার্যকর হয়েছে। এই প্রথম আন্তর্জাতিক জলসীমার সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য রক্ষা ও এর টেকসই ব্যবহারের জন্য একটি সর্বজনীন আইনি কাঠামো তৈরি হলো, যা আগে কোনো সুনির্দিষ্ট নীতিমালার অধীনে ছিল না।
দীর্ঘ দুই দশকের নিরলস আলোচনার পর ২০২৩ সালের জুন মাসে এই চুক্তির চূড়ান্ত খসড়া অনুমোদিত হয়। ২০২৫ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর ৬০টি দেশ এই চুক্তিটি অনুসমর্থন করার মাধ্যমে এর কার্যকারিতার জন্য প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ করে, যার ফলে ১২০ দিনের একটি অপেক্ষমাণ সময়কাল শুরু হয়েছিল। অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক প্রথম সহকারী সচিব এবং বিবিএনজে প্রস্তুতিমূলক কমিশনের সহ-সভাপতি অ্যাডাম ম্যাককার্টি এই চুক্তির গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন যে, পৃথিবীর পৃষ্ঠের প্রায় অর্ধেক অংশ জুড়ে থাকা এই উচ্চ সমুদ্র এখন প্রথমবারের মতো একটি সুশৃঙ্খল আইনি ব্যবস্থার আওতায় আসবে। বর্তমানে এই চুক্তিতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং এর ১৬টি সদস্য রাষ্ট্রসহ মোট ৮১টি পক্ষ রয়েছে। এ পর্যন্ত চীন, ব্রাজিল, জার্মানি, ফ্রান্স এবং জাপানের মতো প্রভাবশালী দেশসহ মোট ১৪৫টি রাষ্ট্র এই দলিলে স্বাক্ষর করেছে।
এই চুক্তির মূল লক্ষ্য হলো অতিরিক্ত মাছ ধরা, দূষণ এবং জীববৈচিত্র্যের আশঙ্কাজনক হ্রাস মোকাবিলা করা। ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বের অন্তত ৩০ শতাংশ মহাসাগরকে সুরক্ষিত করার যে বৈশ্বিক লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, তা অর্জনে এই চুক্তিটি একটি অপরিহার্য হাতিয়ার। বিবিএনজে চুক্তির মাধ্যমে খোলা সমুদ্রে 'সামুদ্রিক সংরক্ষিত এলাকা' (MPA) প্রতিষ্ঠার ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে এবং সামুদ্রিক পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে এমন যেকোনো কাজের জন্য বাধ্যতামূলক 'পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন' (EIA) করার নিয়ম চালু করা হয়েছে। এছাড়াও, সামুদ্রিক জেনেটিক সম্পদ (MGR) থেকে প্রাপ্ত সুফলের সুষম বণ্টন এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধিতে প্রযুক্তি হস্তান্তরের বিধানও এতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এই চুক্তির গুরুত্ব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছেন যে, সমুদ্রের সুস্বাস্থ্য সরাসরি মানবজাতির সুস্থতার সাথে জড়িত। চুক্তিটি কার্যকর হওয়ার এক বছরের মধ্যে এর প্রধান নীতি-নির্ধারক সংস্থা 'কনফারেন্স অফ দ্য পার্টিস' (COP) তাদের প্রথম বৈঠকে মিলিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই চুক্তিটি দূষণকারীদের ওপর আর্থিক ও আইনি দায়বদ্ধতা আরোপ করে এবং বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য আধুনিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করে, যা আগের আইনগুলোর তুলনায় অনেক বেশি কার্যকর। জাতিসংঘের সমুদ্র আইন বিষয়ক কনভেনশনের (UNCLOS) ওপর ভিত্তি করে তৈরি এই চুক্তিটি সমুদ্র সম্পদ ব্যবহারের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করবে এবং জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সহায়তা করবে।
তবে এই চুক্তির পূর্ণাঙ্গ কার্যকারিতা নিয়ে কিছু প্রশ্ন এখনও রয়ে গেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ২০২৩ সালে এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করলেও এখন পর্যন্ত তা অনুসমর্থন করেনি। অন্যদিকে, রাশিয়া ফেডারেশন এই চুক্তিটি কার্যকর হওয়ার সময় পর্যন্ত এতে স্বাক্ষর বা অনুসমর্থন কোনটিই করেনি। এই বৃহৎ শক্তিগুলোর অনুপস্থিতি চুক্তির সর্বজনীন প্রয়োগের ক্ষেত্রে একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিতে পারে।
30 দৃশ্য
উৎসসমূহ
annahar.com
European Commission - High Seas Treaty enters into force: A milestone for ocean conservation
UN News - Historic High Seas Treaty enters into force, launching a new era of global ocean governance
Prism News - High Seas treaty to take effect January 17, 2026, reshaping ocean governance
Intergovernmental Oceanographic Commission - BBNJ Agreement Successfully Ratified
Daily Sabah - High Seas Treaty takes effect with Türkiye among participating states
এই বিষয়ে আরও খবর পড়ুন:
আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।
