লুয়ান্ডায় ইইউ-আফ্রিকা ইউনিয়নের সপ্তম শীর্ষ সম্মেলন: বহুপাক্ষিকতা জোরদার ও কৌশলগত অংশীদারিত্ব
সম্পাদনা করেছেন: Iryna Balihorodska
আফ্রিকা ইউনিয়ন এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সপ্তম যৌথ শীর্ষ সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হতে চলেছে ২০২৫ সালের ২৪ থেকে ২৫ নভেম্বর। এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকটির আয়োজন করা হয়েছে অ্যাঙ্গোলার রাজধানী লুয়ান্ডায়। এই সম্মেলনের তাৎপর্য আরও গভীর, কারণ এটি কায়রোতে ২০০০ সালে স্বাক্ষরিত চুক্তির মাধ্যমে দুই মহাদেশের মধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে অংশীদারিত্ব শুরু হওয়ার ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত হচ্ছে। বিশ্বজুড়ে যখন অস্থিরতা বাড়ছে এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চে প্রতিযোগিতা তীব্র হচ্ছে, তখন এই মিলনক্ষেত্রটি সহযোগিতা আরও দৃঢ় করার জন্য এক অপরিহার্য মঞ্চ হিসেবে কাজ করছে। সম্মেলনের মূল প্রতিপাদ্য হলো—কার্যকর বহুপাক্ষিক পদ্ধতির মাধ্যমে শান্তি ও সমৃদ্ধি অর্জন করা, যা রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ইইউ এবং আফ্রিকার যৌথ অঙ্গীকারকে প্রতিফলিত করে।
এই উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকটি যৌথভাবে পরিচালনা করছেন অ্যাঙ্গোলার রাষ্ট্রপতি জোয়াও লোরেনসো, যিনি বর্তমানে আফ্রিকান ইউনিয়নের সভাপতি, এবং ইউরোপীয় কাউন্সিলের সভাপতি আন্তোনিও কোস্টা। এছাড়াও, সভায় উপস্থিত থাকছেন এইউ কমিশনের চেয়ারম্যান মাহমুদ আলী ইউসুফ এবং ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেইন। কেবল রাজনৈতিক আলোচনাতেই সীমাবদ্ধ না থেকে, এই শীর্ষ সম্মেলনের পাশাপাশি নাগরিক সমাজ, যুব সম্প্রদায় এবং ব্যবসায়িক প্রতিনিধিদের জন্য সমান্তরাল ফোরামের আয়োজন করা হয়েছে। এর ফলে বিনিয়োগ ও উন্নয়ন সংক্রান্ত ব্যবহারিক উদ্যোগগুলির সঙ্গে রাজনৈতিক আলোচনার মেলবন্ধন ঘটানো সম্ভব হচ্ছে।
আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে নিরাপত্তা, শান্তি স্থাপন, অর্থনৈতিক সংহতি, বাণিজ্য সহযোগিতা, এবং একইসঙ্গে সবুজ ও ডিজিটাল রূপান্তরের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি। এই লক্ষ্যগুলি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ইউরোপীয় ইউনিয়নের 'গ্লোবাল গেটওয়ে' কৌশলটি একটি মুখ্য হাতিয়ার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই কৌশলটি অবকাঠামো, জ্বালানি এবং ডিজিটাল খাতে বিনিয়োগ আকর্ষণের ওপর জোর দেয়। ইউরোপীয় কমিশনের বিবৃতি এবং বিশেষজ্ঞদের অনুমান অনুযায়ী, এই উদ্যোগের মাধ্যমে ইতোমধ্যে প্রায় ৩০৬ বিলিয়ন ইউরো অর্থ সংগৃহীত হয়েছে। যদিও এটি একটি পূর্বাভাস, তবে ২০২৭ সালের মধ্যে এই অঙ্ক ৪০০ বিলিয়ন ইউরো ছাড়িয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে, যা দুই পক্ষের উচ্চাকাঙ্ক্ষী যৌথ পরিকল্পনাকে স্পষ্ট করে তোলে।
নিরাপত্তা প্রসঙ্গে বলতে গেলে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন আফ্রিকান ইউনিয়নকে ইউরোপীয় পিস ফ্যাসিলিটির (European Peace Facility) মাধ্যমে সহায়তা প্রদান করে আসছে। ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে এইউ-এর সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য প্রায় ৬০০ মিলিয়ন ইউরো বরাদ্দ করা হয়েছে, যার মধ্যে শান্তি রক্ষা অভিযানগুলিও অন্তর্ভুক্ত। যদিও নির্দিষ্ট কোনো মিশনের জন্য অর্থের পরিমাণ ভিন্ন হতে পারে, তবে এই সহায়তার সামগ্রিক প্রভাব সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে স্থিতিশীলতা বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে।
আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আফ্রিকার দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগুলির সঙ্গে এই অংশীদারিত্বকে সংযুক্ত করা, বিশেষত 'এজেন্ডা ২০৬৩'-এর দ্বিতীয় দশকব্যাপী পরিকল্পনার বাস্তবায়ন। এই পরিকল্পনা, যা ২০২৪ থেকে ২০৩৩ সাল পর্যন্ত বিস্তৃত, মহাদেশের অবকাঠামো উন্নয়ন, নিরাপত্তা জোরদারকরণ এবং আফ্রিকার দেশগুলির বৈশ্বিক প্রভাব বৃদ্ধির রূপরেখা তৈরি করে। যদিও এই পরিকল্পনার অধীনে ইইউ-এর সরাসরি আর্থিক প্রতিশ্রুতি এখনো মূলত উৎসাহমূলক এবং সহায়ক প্রকৃতির, তবুও শীর্ষ সম্মেলনের আলোচনাগুলি যৌথ উদ্যোগগুলিকে আরও গতিশীল করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সার্বিকভাবে, লুয়ান্ডার এই বৈঠক রাজনৈতিক সংলাপ এবং ব্যবহারিক সহযোগিতার ক্ষেত্রকে আরও শক্তিশালী করার সুযোগ এনে দিয়েছে। একটি যৌথ ঘোষণা গ্রহণের মাধ্যমে আগামী বছরগুলির জন্য কৌশলগত দিকনির্দেশনা সুনির্দিষ্ট করা সম্ভব হবে এবং অবকাঠামো উন্নয়ন, নিরাপত্তা সহায়তা ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রগুলি চিহ্নিত করা যাবে। তবে, এই অংশীদারিত্বের সাফল্য আগামী দশকে নির্ভর করবে সদস্য রাষ্ট্রগুলির সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ এবং কার্যকরভাবে বিনিয়োগ আকর্ষণের ওপর, যা এই সহযোগিতার মূল চালিকাশক্তি হবে।
উৎসসমূহ
The Presidency - Republic of South Africa
Polity.org.za
Africa-Europe Innovation Platform
এই বিষয়ে আরও খবর পড়ুন:
আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?
আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।
