ব্রাজিলের ক্ষুধা মানচিত্র থেকে মুক্তি: সামাজিক নীতির স্থায়িত্ব ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ

সম্পাদনা করেছেন: Tatyana Hurynovich

২০২৬ সালে ব্রাজিল এক অনন্য মাইলফলক অর্জন করেছে, যা বিশ্ব দরবারে দেশটির ভাবমূর্তিকে উজ্জ্বল করেছে। এফএও (FAO) সোফি ২০২৫ রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যবর্তী তিন বছরের পর্যালোচনায় ব্রাজিল নিজেকে বিশ্ব ক্ষুধা মানচিত্র বা 'গ্লোবাল হাঙ্গার ম্যাপ' থেকে সফলভাবে সরিয়ে নিতে সক্ষম হয়েছে। এই অভাবনীয় সাফল্যের মূলে রয়েছে অপুষ্টির ঝুঁকিতে থাকা জনসংখ্যার হার ২.৫ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনা। মূলত সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিগুলোর পুনরুজ্জীবন এবং ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে ক্ষুধা সম্পূর্ণ নির্মূল করার দৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকারই এই পরিবর্তন সম্ভব করেছে। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ব্রাজিল এর আগে ২০১৪ সালে প্রথমবার এই তালিকা থেকে মুক্ত হয়েছিল, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত ২০১৮ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে পুনরায় সেখানে অন্তর্ভুক্ত হয়। এই উত্থান-পতন প্রমাণ করে যে, খাদ্য নিরাপত্তার লড়াইয়ে ধারাবাহিকতা বজায় রাখা কতটা চ্যালেঞ্জিং।

বর্তমানের এই সাফল্য ১৯৬০ সালে প্রকাশিত ক্যারোলিনা মারিয়া ডি জেসাসের কালজয়ী সাহিত্যকর্ম ‘কোয়ার্তো দে ডেসপেজো: ডায়ারিও ডি উমা ফাভেলাডা’-এর সেই করুণ ও বাস্তবধর্মী স্মৃতির কথা মনে করিয়ে দেয়। ১৯৫৫ থেকে ১৯৬০ সালের মধ্যে সাও পাওলোর কানান্দে বস্তিতে একজন কাগজ কুড়ানি হিসেবে জীবন সংগ্রামের পাশাপাশি তিনি তার ডায়েরিতে সামাজিক বৈষম্যের যে চিত্র এঁকেছিলেন, তা আজও প্রাসঙ্গিক। তিনি অত্যন্ত সাহসের সাথে লিখেছিলেন, "যারা পেট ভরে আহার করে, তারাই ক্ষুধার উদ্ভাবন করেছে।" তার এই ক্ষুরধার উক্তিটি দারিদ্র্য ও চরম অভাবের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে একটি টেকসই সরকারি নীতির প্রয়োজনীয়তাকে বারবার স্মরণ করিয়ে দেয়। সামাজিক উন্নয়ন ও ক্ষুধা নিবারণ মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৩ সালের শেষ নাগাদ ব্রাজিলের প্রায় ২৪ মিলিয়ন মানুষকে তীব্র খাদ্য অনিরাপত্তার অন্ধকার থেকে আলোর পথে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে।

যদিও ব্রাজিল আনুষ্ঠানিকভাবে এই সাফল্য উদযাপন করছে, তবুও অর্থনীতিবিদ এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর প্রতিনিধিরা সতর্ক করেছেন যে, ক্ষুধা নির্মূল কোনো গন্তব্য নয় বরং এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। ব্রাজিলে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (WFP)-এর প্রতিনিধি এবং সেন্টার অফ এক্সিলেন্স এগেইনস্ট হাঙ্গার-এর পরিচালক ড্যানিয়েল বালাবান এই বিষয়ে বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন। তিনি মনে করেন, সামাজিক সহায়তা কর্মসূচিগুলোতে সামান্যতম শিথিলতা বা অর্থায়ন বন্ধ করে দিলে সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠী আবারও চরম সংকটের মুখে পড়তে পারে। উল্লেখ্য যে, ২০১১ সাল থেকে ব্রাজিল সরকারের সাথে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে কাজ করা এই সেন্টারটি ২০২৬ সালেও কারিগরি সহায়তা এবং দক্ষিণ-দক্ষিণ সংলাপের মাধ্যমে ক্ষুধার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বিশ্বব্যাপী নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছে।

ব্রাজিলের খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থার একটি শক্তিশালী স্তম্ভ হলো ন্যাশনাল স্কুল ফুড প্রোগ্রাম (PNAE)। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে রেজোলিউশন CD/FNDE নং ১/২০২৬-এর মাধ্যমে এই কর্মসূচির মাথাপিছু বরাদ্দ ১৪.৩৫ শতাংশ বৃদ্ধি করা হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় (MEC) এবং FNDE-এর এই সময়োপযোগী উদ্যোগের মূল লক্ষ্য ছিল মুদ্রাস্ফীতির কারণে কমে যাওয়া ক্রয়ক্ষমতা পুনরুদ্ধার করা এবং দেশের প্রায় ৪০ মিলিয়ন শিক্ষার্থীর জন্য মানসম্মত পুষ্টি নিশ্চিত করা। এই কর্মসূচির একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো, এর মোট বাজেটের অন্তত ৪৫ শতাংশ স্থানীয় পারিবারিক খামার বা ক্ষুদ্র কৃষকদের কাছ থেকে পণ্য ক্রয়ে ব্যয় করার আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এর ফলে কেবল শিক্ষার্থীদের পুষ্টিই নিশ্চিত হচ্ছে না, বরং স্থানীয় গ্রামীণ অর্থনীতিও সচল ও শক্তিশালী হচ্ছে।

এই অর্জনের দীর্ঘমেয়াদী স্থায়িত্ব নিশ্চিত করার জন্য ড্যানিয়েল বালাবান একটি সমন্বিত 'রাজনৈতিক কাঠামো' বা 'পলিটিক্যাল স্ট্রাকচার' গড়ে তোলার ওপর জোর দিয়েছেন। তার মতে, বোলসা ফ্যামিলিয়া, জাতীয় স্বাস্থ্য ব্যবস্থা (SUS), খাদ্য ক্রয় কর্মসূচি (PAA) এবং ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধির মতো বিষয়গুলোকে একটি অভিন্ন সূত্রে গাঁথতে হবে। তিনি সংসদীয় সংশোধনীতে বিপুল পরিমাণ বাজেট বরাদ্দের কঠোর সমালোচনা করে সেই অর্থ সরাসরি সামাজিক উন্নয়নমূলক কাজে ব্যয়ের আহ্বান জানিয়েছেন। ২০২৬ সালে ব্রাজিলের এই সংগ্রাম কেবল ক্ষুধার বিরুদ্ধে নয়, বরং কাঠামোগত বৈষম্য দূর করার জন্যও সমানভাবে চলমান। বিশেষ করে শ্রমবাজারে লিঙ্গ বৈষম্য হ্রাসে সাও পাওলো রাজ্যের 'সেলো লিলাস' (Selo Lilás) এর মতো উদ্যোগগুলো এই লড়াইয়ে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

ক্ষুধা মানচিত্র থেকে ব্রাজিলের এই ঐতিহাসিক প্রস্থান ছিল মন্ত্রী ওয়েলিংটন ডায়াসের প্রধান লক্ষ্য, যা তিনি ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে দায়িত্ব গ্রহণের সময় ঘোষণা করেছিলেন। সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক পদক্ষেপ, সরকারি ও বেসরকারি খাতের সমন্বয় এবং নাগরিক সমাজের সক্রিয় অংশগ্রহণের ফলেই এই অসম্ভবকে সম্ভব করা গেছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ব্রাজিলে বেকারত্বের হার ৫.১ শতাংশে নেমে এসেছে, যা দেশটির ইতিহাসে এক অনন্য রেকর্ড। এই সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং সামাজিক নিরাপত্তার মেলবন্ধনই প্রমাণ করে যে, ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত সমাজ গড়তে হলে সামাজিক কর্মসূচিগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন বাজেট বরাদ্দ এবং রাজনৈতিক অগ্রাধিকার দেওয়া কতটা অপরিহার্য।

3 দৃশ্য

উৎসসমূহ

  • VEJA

  • As Nações Unidas no Brasil

  • WFP Centro de Excelência contra a Fome Brasil

  • Fundo Nacional de Desenvolvimento da Educação

  • Ministério do Desenvolvimento e Assistência Social, Família e Combate à Fome

  • pauseperin.adv.br

আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।