আবু ধাবি ভিত্তিক বিমান সংস্থা ইতিহাদ এয়ারওয়েজ তাদের বাণিজ্যিক বিমান চলাচল কার্যক্রম পর্যায়ক্রমে পুনরায় শুরু করার একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের আকাশপথে সাম্প্রতিক সময়ে যে নজিরবিহীন অস্থিরতা ও বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছিল, তার প্রেক্ষাপটে এই পদক্ষেপটি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসার একটি অত্যন্ত সতর্ক ও সুপরিকল্পিত প্রচেষ্টার ইঙ্গিত দেয়। ২০২৬ সালের ৬ মার্চ থেকে ১৯ মার্চের মধ্যে এই কার্যক্রম কার্যকর করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে কাজ করবে আবু ধাবির অত্যাধুনিক জায়েদ ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট। এই সিদ্ধান্তটি হুট করে নেওয়া হয়নি; বরং এটি একটি সামগ্রিক নিরাপত্তা মূল্যায়ন এবং সংশ্লিষ্ট বিমান চলাচল নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর কাছ থেকে প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র ও অনুমোদন পাওয়ার পরেই বাস্তবায়িত হচ্ছে।
সংকটকালীন সময়ে এয়ারলাইনটির প্রাথমিক সাড়া ছিল অত্যন্ত জোরালো, যেখানে তারা মধ্যপ্রাচ্যে আটকে পড়া হাজার হাজার নাগরিককে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার জন্য ১৮টি ভিন্ন দেশে বিশেষ প্রত্যাবাসন ফ্লাইট পরিচালনা করেছিল। এই মানবিক ও লজিস্টিক তৎপরতা এমন এক সময়ে পরিচালিত হয়েছে যখন বৈশ্বিক বিমান চলাচল শিল্প চরম আর্থিক ও অপারেশনাল চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন বিমানবন্দরে ২৩ হাজারেরও বেশি ফ্লাইট বাতিল করতে হয়েছে, যার ফলে প্রায় ৪.৪ মিলিয়ন যাত্রী আসন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইতিহাদ এয়ারওয়েজের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আন্তোনোয়ালদো নেভেস এই পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছেন যে, আকাশপথের বর্তমান সংবেদনশীলতা এবং নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে আপাতত একটি সীমিত ও নিয়ন্ত্রিত সময়সূচীর মাধ্যমেই ফ্লাইটগুলো পরিচালনা করা হবে।
২০২৬ সালের ৬ থেকে ১৯ মার্চের এই বিশেষ সময়কালে ইতিহাদ এয়ারওয়েজ বিশ্বের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ শহরের সাথে পুনরায় সংযোগ স্থাপনের পরিকল্পনা করেছে। এর মধ্যে রয়েছে মস্কোর শেরেমেতিয়েভো এবং সেন্ট পিটার্সবার্গের মতো কৌশলগত গন্তব্যসমূহ। এছাড়াও লন্ডন (হিথ্রো), প্যারিস, ফ্রাঙ্কফুর্ট, নিউ ইয়র্ক (জেএফকে) এবং টরন্টোর মতো ইউরোপ, এশিয়া ও উত্তর আমেরিকার প্রধান শহরগুলোতেও ফ্লাইট চলাচল শুরু হবে। প্রায় এক সপ্তাহব্যাপী স্থগিতাদেশের পর এয়ারলাইনটি ধাপে ধাপে প্রায় ৭০টি গন্তব্যে তাদের নেটওয়ার্ক পুনরুদ্ধার করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে। তবে যাত্রীদের মনে রাখা প্রয়োজন যে, অন্যান্য নিয়মিত বাণিজ্যিক ফ্লাইটগুলো এখনও সাময়িকভাবে স্থগিত রয়েছে। তাই এয়ারলাইন থেকে সুনির্দিষ্ট নিশ্চিতকরণ বা বৈধ বুকিং না থাকা পর্যন্ত কাউকে বিমানবন্দরে না আসার জন্য কঠোরভাবে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
এই ফ্লাইটগুলো পুনরায় চালু করার প্রেক্ষাপটটি মূলত ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া আঞ্চলিক উত্তেজনার সাথে জড়িত, যখন ইরান লক্ষ্য করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক পদক্ষেপের ফলে পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছিল। সেই সময় নিরাপত্তার খাতিরে কাতার, ইরাক, বাহরাইন এবং কুয়েতসহ এই অঞ্চলের অনেক দেশ তাদের আকাশপথ সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে বন্ধ করে দিয়েছিল। ইতিহাদ এয়ারওয়েজ যখন তাদের কার্যক্রম সীমিত পরিসরে শুরু করছে, তখন এমিরেটসের মতো অন্যান্য বৃহৎ আঞ্চলিক বিমান সংস্থাও তাদের ফ্লাইট সূচী ধীরে ধীরে স্বাভাবিক করার পথে হাঁটছে। ক্ষতিগ্রস্ত যাত্রীদের সুবিধার্থে ইতিহাদ ২০২৬ সালের ১৫ মে পর্যন্ত টিকিট পুনরায় বুক করার একটি নতুন সময়সীমা নির্ধারণ করেছে, যা এই সংকটময় সময়ে গ্রাহক সেবার প্রতি তাদের অবিচল নিষ্ঠার পরিচয় দেয়।
আংশিকভাবে ফ্লাইট চালুর এই সিদ্ধান্তটি অপারেশনাল স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে ইতিহাদের দৃঢ় সংকল্পকে তুলে ধরে, যদিও প্রতিটি পদক্ষেপে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে। বর্তমানে ফ্লাইট শিডিউল পরিবর্তন এবং বুকিং সিস্টেমে অতিরিক্ত চাপের কারণে জিডিএস (GDS)-এর মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অর্থ ফেরত বা রিফান্ড প্রক্রিয়াটি সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা হয়েছে। তবে বিএসপি (BSP) সিস্টেমের মাধ্যমে রিফান্ডের আবেদনগুলো গ্রহণ করা অব্যাহত রয়েছে, যদিও প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হতে স্বাভাবিকের চেয়ে কিছুটা বেশি সময় লাগতে পারে। সীমিত সময়সূচী এবং যাত্রীদের সাথে সরাসরি যোগাযোগের ওপর ভিত্তি করে তৈরি এই কৌশলটি স্পষ্ট করে দেয় যে, আকাশপথের নিরাপত্তা এবং অপারেশনাল সমন্বয় নিশ্চিত করাই এখন ইতিহাদ এয়ারওয়েজ ও বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের প্রধান অগ্রাধিকার।



