২০২৫ সালের শেষ ভাগে ইরান এক তীব্র অর্থনৈতিক সংকটের সম্মুখীন হয়, যা দেশব্যাপী ব্যাপক গণবিক্ষোভ ও ধর্মঘটের জন্ম দেয়। এই অস্থিরতার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল ইরানি রিয়ালের রেকর্ড দরপতন এবং লাগামহীন মুদ্রাস্ফীতি, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর গুরুতর চাপ সৃষ্টি করে। বিক্ষোভের সূত্রপাত ঘটে গত ২৮ ডিসেম্বর, ২০২৩, তেহরানের ঐতিহ্যবাহী গ্র্যান্ড বাজারের বণিক ও ব্যবসায়ীদের ধর্মঘটের মাধ্যমে, যারা রিয়ালের অবমূল্যায়নের প্রতিবাদে দোকানপাট বন্ধ করে দেন। এই অর্থনৈতিক অসন্তোষ দ্রুত রাজনৈতিক রূপ নেয়, যেখানে স্লোগানগুলো সরাসরি ইসলামি প্রজাতন্ত্রের শাসকগোষ্ঠী এবং সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে লক্ষ্য করে উচ্চারিত হয়।
ডিসেম্বরের শেষ নাগাদ খোলা বাজারে এক মার্কিন ডলারের বিপরীতে ইরানি রিয়ালের বিনিময় হার প্রায় ১.৪ মিলিয়ন রিয়ালে পৌঁছেছিল, যা ২০২২ সালের তুলনায় উল্লেখযোগ্য অবমূল্যায়ন নির্দেশ করে। রাষ্ট্রীয় পরিসংখ্যান কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের ডিসেম্বরে বার্ষিক মুদ্রাস্ফীতির হার ছিল ৪২.২ শতাংশ, এবং খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি সেই সময়ে ৫৭.৯০ শতাংশে পৌঁছেছিল। এই অর্থনৈতিক চাপ জুনে ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের ১২ দিনের যুদ্ধের পর এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে পুনরায় কঠোর হওয়া পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে আরও তীব্র হয়।
প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান, যিনি ২০২৪ সালের জুলাই মাসে দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তিনি স্বীকার করেছেন যে সরকারের উচিত জনগণের ন্যায্য দাবি শোনা, অন্যথায় দেশের পরিণতি গুরুতর হতে পারে। বিক্ষোভের বিস্তার ছিল তাৎপর্যপূর্ণ; তেহরানের বাইরে ইসফাহান, শিরাজ, মাশহাদ, হামেদান, কারাজ, মালার্দ, কেরমানশাহ এবং কেশম দ্বীপের মতো বিভিন্ন প্রদেশেও তা ছড়িয়ে পড়ে। নিরাপত্তা বাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে টিয়ার গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করে, এবং কিছু অঞ্চলে সরাসরি গুলি চালানোর খবর পাওয়া যায়, যার ফলে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য ও বিক্ষোভকারী উভয়েরই হতাহতের ঘটনা ঘটে। Kuhdasht-এ আমিরহোসাম খোদায়ারি ফারদ নামের এক ২১ বছর বয়সী বাসিজ সদস্য নিহত হন, এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে দুজন বিক্ষোভকারী নিহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়।
সরকারের প্রতিক্রিয়া ছিল মিশ্র। ডেপুটি এক্সিকিউটিভ প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ জাফর ঘেমপানাহ মুদ্রাস্ফীতির জন্য পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা ও 'অর্থনৈতিক যুদ্ধকে' দায়ী করেন, অন্যদিকে সরকার জনগণের চাপ অনুভব করার কথা জানায়। এই অস্থিরতার মধ্যে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর মোহাম্মদ রেজা ফারজিন পদত্যাগ করেন এবং তার স্থলাভিষিক্ত হন সাবেক অর্থমন্ত্রী আবদোলনাসের হেম্মাতি। সরকার আকস্মিকভাবে ২১টি প্রদেশে ঠান্ডা আবহাওয়ার অজুহাতে গণছুটি ঘোষণা করে, যা বিশ্লেষকদের মতে বড় ধরনের সমাবেশ এড়ানোর কৌশল ছিল। এই ঘটনা ২০২২ সালের 'নারী, জীবন, স্বাধীনতা' আন্দোলনের ধারাবাহিকতা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যা ইরানের স্থিতিশীলতার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও বিরোধী পক্ষগুলো এই সংকটকে গভীর উদ্বেগজনক দৃষ্টিতে দেখছে। নোবেল বিজয়ী শিরিন এবাদি মনে করেন ইসলামিক প্রজাতন্ত্র তার 'শেষ দিনগুলিতে' রয়েছে, অন্যদিকে রাজনৈতিক কর্মী মোস্তফা তাজজেদাহ সতর্ক করেছেন যে স্পষ্ট কোনো বহির্গমন কৌশল ছাড়া দেশটি 'বিশৃঙ্খলা ও নৈরাজ্যের' দিকে যেতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মন্তব্য করেন যে ইরানের অর্থনীতি ভেঙে পড়েছে এবং জনগণ অসন্তুষ্ট। এই পটভূমিতে, ইরানের পার্লামেন্ট অক্টোবর ২০২৫-এ রিয়াল থেকে চারটি শূন্য বাদ দিয়ে নতুন মুদ্রা 'কিরান' প্রবর্তনের জন্য একটি মুদ্রা পুনঃনামকরণ পরিকল্পনা অনুমোদন করেছিল, যা মুদ্রাস্ফীতির ভয়াবহতাকে তুলে ধরে। প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক কাঠামো ও ব্যাংকিং পরিষেবা সংস্কারের মাধ্যমে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানোর অঙ্গীকার করলেও, ইরানের আঞ্চলিক নীতি নির্ধারণে প্রভাবশালী রেভল্যুশনারি গার্ডস (IRGC)-এর কারণে প্রেসিডেন্টের নীতিগত পরিবর্তনের ক্ষমতা সীমিত বলে ধারণা করা হয়। মানবাধিকার সংস্থা আইএইচআর (IHR) এবং এইচআরএনএ (HRANA) জানিয়েছে, দমন-পীড়নের অংশ হিসেবে ২০২২ সালে ইরানে যথাক্রমে ১,৫০০ বা ১,৯২২ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল, যা ছিল এক উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি।




