তিন দেশে বিতর্কিত নির্বাচন: সংঘাত, বয়কট ও ক্ষমতা ধরে রাখার কৌশল
সম্পাদনা করেছেন: gaya ❤️ one
২০২৫ সালের ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে বিশ্বজুড়ে তিনটি ভিন্ন রাষ্ট্রে প্রায় একই সময়ে অনুষ্ঠিত নির্বাচনগুলো গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতা এবং ক্ষমতা ধরে রাখার কৌশল নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। মিয়ানমার, মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্র (সিএআর) এবং আইভরি কোস্টে অনুষ্ঠিত এই ভোটগুলো কর্তৃত্ববাদী বা প্রতিষ্ঠিত শাসনের অধীনে বৈধতা অর্জনের প্রচেষ্টার প্রতিফলন ঘটায়, যা বিশ্বব্যাপী গণতান্ত্রিক পশ্চাদপসরণের চলমান ধারাকে তুলে ধরে।
মিয়ানমারে, সামরিক জান্তা দেশটির চলমান গৃহযুদ্ধের মধ্যেই একটি বহুল সমালোচিত তিন-পর্যায়ের সাধারণ নির্বাচন শুরু করেছে, যা ২৮ ডিসেম্বর রবিবার প্রথম ধাপে শুরু হয়। এই নির্বাচনকে সামরিক সরকার গণতন্ত্রের দিকে একটি পদক্ষেপ হিসেবে উপস্থাপন করলেও, আন্তর্জাতিক মহল এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলো এটিকে জান্তার শাসনকে বৈধতা দেওয়ার একটি কৌশল হিসেবে দেখছে। স্টেট সিকিউরিটি অ্যান্ড পিস কমিশন (এসএসপিসি) এই নির্বাচনের সময় নির্বাচন বিঘ্নিত করার প্রচেষ্টার জন্য ২০০ জনেরও বেশি লোককে অভিযুক্ত করেছে। সিনিয়র জেনারেল মিন অং হ্লাইং নিজে ভোট দিয়ে নির্বাচনকে 'মুক্ত ও সুষ্ঠু' বলে অভিহিত করেছেন, যদিও জাতিসংঘ অনুমান করে যে ২০২৬ সালে প্রায় ১৬ মিলিয়ন মানুষের জীবন রক্ষাকারী সহায়তার প্রয়োজন হবে। এই নির্বাচন এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে যখন সামরিক বাহিনী দেশের অর্ধেকেরও কম ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণ করে এবং অং সান সু চি-এর মতো ব্যক্তিত্বরা কারাবন্দী রয়েছেন।
মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রে (সিএআর), প্রেসিডেন্ট ফাউস্টিন-আর্চেঞ্জ তুয়াদেঁরা একটি ঐতিহাসিক চতুর্মুখী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন, যেখানে রাষ্ট্রপতি, আইনসভা, আঞ্চলিক এবং পৌরসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। তুয়াদেঁরা, যিনি ২০১৬ সাল থেকে ক্ষমতায় রয়েছেন, ২০২৩ সালের সাংবিধানিক গণভোটের মাধ্যমে মেয়াদ সীমা অপসারণের পর বিতর্কিতভাবে তৃতীয় মেয়াদের জন্য লড়ছেন। এই নির্বাচনে প্রায় ২.৩৯ মিলিয়ন নিবন্ধিত ভোটার অংশ নেয় এবং অন্তর্বর্তী ফলাফল ৫ জানুয়ারি, ২০২৬-এর মধ্যে প্রত্যাশিত। তুয়াদেঁরার সরকার নিরাপত্তা স্থিতিশীলতার ইঙ্গিত দিলেও, বিরোধীরা, যেমন অ্যানিসেট-জর্জেস ডোলোগুয়েলে এবং হেনরি-মেরি ডন্ড্রা, প্রচারণায় বাধা দেওয়ার অভিযোগ এনেছেন। সমালোচকরা মনে করেন, এই নির্বাচন তুয়াদেঁরার আজীবন শাসনের পথ প্রশস্ত করার একটি প্রচেষ্টা, যা রাশিয়ান সহায়তায় পরিচালিত হচ্ছে।
অন্যদিকে, আইভরি কোস্টে, ২৭ ডিসেম্বর শনিবার সংসদীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, যা রাষ্ট্রপতি আলসান ওয়াটারার বিতর্কিত পুনঃনির্বাচনের দুই মাস পরে আসে। এই নির্বাচনে ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির ২৫৫টি আসন পুনর্নবীকরণের জন্য ভোট হলেও, বিরোধী দলগুলোর বয়কটের কারণে ভোটার উপস্থিতি ছিল অত্যন্ত কম। ২৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রাথমিক অংশগ্রহণ হার ছিল মাত্র ৩২.৩৫%, যা ২০২১ সালের ৩৭.৮৮% টার্নআউটের চেয়েও কম। ক্ষমতাসীন দল রিওপোলিকান হুপোয়েটিস্ট ফর ডেমোক্রেসি অ্যান্ড পিস (আরএইচডিপি)-এর বিরুদ্ধে অবৈধ ভোটার তথ্য সংগ্রহ এবং ঘুষ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। লরেন্ট গ্যাগবোর নেতৃত্বাধীন আফ্রিকান পিপলস পার্টি (পিপিএ-সিআই) নির্বাচনের পরিবেশকে অবিশ্বস্ত আখ্যা দিয়ে ভোট বর্জন করে। এই পরিস্থিতিতে, ওয়াটারার সরকার রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা জোরদার করার আহ্বান জানালেও, এই নির্বাচন ক্ষমতাসীন দলের নিরঙ্কুশ আধিপত্য বজায় রাখার একটি প্রচেষ্টা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এই তিনটি ভিন্ন ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, যেখানে মিয়ানমারে সরাসরি সামরিক শক্তি প্রয়োগ করা হচ্ছে, সিএআর-এ সাংবিধানিক পরিবর্তনকে হাতিয়ার করা হচ্ছে, এবং আইভরি কোস্টে প্রধান বিরোধী পক্ষকে পদ্ধতিগতভাবে বাইরে রেখে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে—সব ক্ষেত্রেই নির্বাচনের মূল উদ্দেশ্য গণতান্ত্রিক চর্চা থেকে সরে গিয়ে ক্ষমতা কাঠামোকে সুসংহত করার দিকে ঝুঁকেছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রধান ভলকার তুর্ক মিয়ানমারের পরিস্থিতিকে সহিংসতা ও ভয়ের পরিবেশ হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জন্য মৌলিক শর্তাবলীর অভাবকে নির্দেশ করে। এই বৈশ্বিক প্রবণতা ইঙ্গিত দেয় যে, অনেক অঞ্চলে নির্বাচন এখন জবাবদিহিতার পরিবর্তে শাসন টিকিয়ে রাখার একটি আনুষ্ঠানিকতা মাত্র।
13 দৃশ্য
উৎসসমূহ
Deutsche Welle
Daily Mail Online
Daily Mail Online
US-ASEAN Business Council
The Guardian
United Nations News
Council on Foreign Relations
Mothership.SG
Associated Press
The Straits Times
Reuters
CGTN
Afriquinfos
Ivory Coast parliamentary elections draw low turnout | International | Bangladesh Sangbad Sangstha (BSS)
Ivory Coast president seeks parliament majority in election - Arab News
এই বিষয়ে আরও খবর পড়ুন:
আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?
আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।
