গুগল ডিপমাইন্ডের আলফাজিনোম: ১ মেগাবাইট পর্যন্ত ডিএনএ বিশ্লেষণের নতুন এআই মডেল
সম্পাদনা করেছেন: Maria Sagir
গুগল ডিপমাইন্ডের গবেষণা দল তাদের সাম্প্রতিক উদ্ভাবন 'আলফাজিনোম' (AlphaGenome) নামক একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মডেলের ঘোষণা দিয়েছে, যা কম্পিউটেশনাল জিনোমিক্সের জগতে একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ২০২৬ সালের ২৮ জানুয়ারি 'নেচার' (Nature) জার্নালে এই যুগান্তকারী গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়। এই নতুন এআই মডেলটি ডিএনএ-র দীর্ঘ সিকোয়েন্স, যা প্রায় ১০ লক্ষ বা ১ মেগাবাইট (১ এমবি) পর্যন্ত বিস্তৃত, অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা রাখে। এই উদ্ভাবনটি বিজ্ঞানীদের জন্য ডিএনএ-র জটিল গঠন বোঝার পথ আরও প্রশস্ত করে তুলেছে।
আলফাজিনোম মূলত তাদের পূর্ববর্তী মডেল 'বোরজোই' (Borzoi)-এর একটি উন্নত সংস্করণ। যেখানে বোরজোই সর্বোচ্চ ৫ লক্ষ বেস পেয়ার পর্যন্ত তথ্য বিশ্লেষণ করতে পারত, সেখানে আলফাজিনোম তার দ্বিগুণ সক্ষমতা প্রদর্শন করছে। এই বিশাল 'কনটেক্সট উইন্ডো' মডেলটিকে জিনোমের ভেতরে থাকা দীর্ঘ রেগুলেটরি মিথস্ক্রিয়াগুলো আরও কার্যকরভাবে শনাক্ত করতে সাহায্য করে। এই মডেলের স্থাপত্যটি মূলত ইউ-নেট (U-Net) কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে নির্মিত। এতে তথ্য সারসংক্ষেপ করার জন্য একটি এনকোডার, দীর্ঘমেয়াদী ডেটা রিলেশনশিপ বোঝার জন্য একটি ট্রান্সফরমার ব্লক এবং প্রতিটি বেস পেয়ারের নির্ভুল আউটপুট প্রদানের জন্য একটি ডিকোডার অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
আলফাজিনোমের অন্যতম শক্তিশালী দিক হলো এর বহুমুখী কার্যকারিতা। এটি একই সাথে জিনোমের ১১টি মৌলিক প্রক্রিয়ার পূর্বাভাস দিতে সক্ষম, যার মধ্যে জিন এক্সপ্রেশন, আরএনএ স্প্লাইসিং এবং ক্রোমাটিন অ্যাক্সেসিবিলিটি অন্যতম। বোরজোই মডেলের তুলনায় আলফাজিনোম স্প্লাইসিং সাইট এবং তাদের ব্যবহার সম্পর্কে আরও গভীর ও বিস্তারিত তথ্য প্রদান করে। গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, জেনেটিক ভেরিয়েন্টের কার্যকরী প্রভাব মূল্যায়নের পরীক্ষায় এই মডেলটি অন্যান্য সমসাময়িক পদ্ধতিকে ছাড়িয়ে গেছে। বিশেষ করে ইকিউটিএল (eQTL) বা জিন এক্সপ্রেশনের সাথে যুক্ত জেনেটিক বৈশিষ্ট্যের পূর্বাভাস দেওয়ার ক্ষেত্রে এটি বোরজোই-এর তুলনায় অনেক বেশি উন্নত ফলাফল দেখিয়েছে।
এই প্রযুক্তির মূল লক্ষ্য হলো বিভিন্ন রোগের জেনেটিক উৎস দ্রুত শনাক্ত করা এবং উন্নত থেরাপিউটিক সমাধান তৈরি করা। মানব ডিএনএ-র প্রায় ৯৮ শতাংশই হলো 'নন-কোডিং' অঞ্চল, যা সরাসরি প্রোটিন তৈরি না করলেও জিনের কার্যকারিতা নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আলফাজিনোম এই রহস্যময় অঞ্চলগুলো গবেষণায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। জিনোমিক্স বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই ধরনের মডেলগুলো ডিএনএ-র স্থির কোডকে একটি জীবন্ত এবং বোধগম্য ভাষায় রূপান্তর করছে। তবে বিশেষজ্ঞরা এটিও মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, আলফাজিনোম এখনো সরাসরি চিকিৎসাক্ষেত্রে রোগ নির্ণয় বা প্রেসক্রিপশন দেওয়ার জন্য উপযুক্ত নয়, কারণ নির্দিষ্ট ব্যক্তির ক্ষেত্রে জিনের পরিবর্তনগুলো নির্ভুলভাবে ধরা এখনো একটি চ্যালেঞ্জ।
বৈজ্ঞানিক গবেষণাকে উৎসাহিত করতে গুগল ডিপমাইন্ড এই মডেলের সোর্স কোড এবং ওয়েটগুলো অ-বাণিজ্যিক ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করে দিয়েছে। গবেষকরা যাতে সহজেই তাদের ল্যাবরেটরিতে এটি ব্যবহার করতে পারেন, সেজন্য একটি এপিআই (API) সুবিধাও প্রদান করা হয়েছে। বর্তমানে বিশ্বের হাজার হাজার বিজ্ঞানী এই টুলটি ব্যবহার করে ক্যানসার এবং অন্যান্য জটিল রোগের জেনেটিক ভিত্তি নিয়ে কাজ করছেন। ক্যানসার বিশেষজ্ঞ এবং জিনোমিক্স গবেষকদের মতে, এই ধরনের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত পদ্ধতিগুলো ভবিষ্যতে জিনোমের আরও নিখুঁত ব্যাখ্যা এবং ব্যক্তিগতকৃত চিকিৎসা পদ্ধতি বা টার্গেটেড থেরাপি তৈরির পথ সুগম করবে।
13 দৃশ্য
উৎসসমূহ
GIGAZINE
Google DeepMind
IFLScience
SiliconANGLE
Science Media Centre
Science News
এই বিষয়ে আরও খবর পড়ুন:
আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।
