সমাজবিজ্ঞানী আর্থার সি. ব্রুকস সুখকে একটি প্রায় গাণিতিক সমীকরণ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন, যা মানুষের সচেতন পছন্দের দ্বারা প্রভাবিত হয়। ব্রুকস, যিনি হার্ভার্ড বিজনেস স্কুল এবং হার্ভার্ড কেনেডি স্কুলের অধ্যাপক, তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছেন যে সুখ কেবল একটি অনুভূতি নয়, বরং এটি মনের একটি অবস্থা যা অনুশীলন এবং জ্ঞান দ্বারা অর্জন করা যায়। তাঁর এই বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি ব্যাখ্যা করে যে কেন একটি আপাতদৃষ্টিতে পরিপূর্ণ জীবনও শূন্য মনে হতে পারে এবং কীভাবে সংকটমুক্ত জীবন নিশ্চিত করা যায়। ব্রুকস তাঁর কর্মজীবনে সুখের মূল বিষয়গুলি চিহ্নিত করেছেন, যা সাধারণ মানুষের কাছে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে।
ব্রুকসের মতে, সুখ চারটি মৌলিক উপাদানের সমন্বয়ে গঠিত: জীবনের আনন্দ, অর্জিত সাফল্যের প্রতি সন্তুষ্টি, জীবনের উদ্দেশ্যবোধ এবং সামাজিক তুলনার হ্রাস। তিনি এই উপাদানগুলিকে একত্রিত করে একটি সরল সূত্র তৈরি করেছেন: সুখ = (আনন্দ + সন্তুষ্টি + উদ্দেশ্য) - (সামাজিক তুলনা)। এই কাঠামোটি ব্যবহারকারীদের এই পরিবর্তনশীল উপাদানগুলি সক্রিয়ভাবে পরিচালনা করার মাধ্যমে তাদের 'সুখের হিসাব' উল্লেখযোগ্যভাবে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা দেয়। এই সূত্রটি প্রমাণ করে যে সুখ ভাগ্যের উপর সম্পূর্ণরূপে নির্ভরশীল নয়, বরং এটি ইচ্ছাকৃত জীবনযাত্রার পরিবর্তনের মাধ্যমে অর্জিত হয়।
ব্রুকস সুখের বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত 'হ্যাপি্নেস স্কেল' (Happiness Scale) তৈরি করেছেন, যা এই চলকগুলির একটি যৌক্তিক মূল্যায়ন প্রদান করে। ব্রুকস আরও উল্লেখ করেছেন যে ইতিবাচক ও নেতিবাচক অনুভূতির তীব্রতা সংক্রান্ত মেজাজ বা টেম্পারামেন্ট মূলত সহজাত। তাই, তিনি পরামর্শ দেন যে ব্যক্তিরা তাদের সহজাত আবেগিক ধরনকে মেনে নিয়ে সূত্রের যে অংশগুলি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব, সেগুলির উপর সক্রিয়ভাবে মনোযোগ দিক। তাঁর কাজ এই ধারণাকে সমর্থন করে যে সুখ একটি চূড়ান্ত গন্তব্য নয়, বরং এটি একটি চলমান দিকনির্দেশনা, যার জন্য ধারাবাহিক প্রচেষ্টা প্রয়োজন।
ব্রুকস তাঁর সহকর্মী অপরাহ উইনফ্রের সাথে 'বিল্ড দ্য লাইফ ইউ ওয়ান্ট' গ্রন্থে সুখের চারটি স্তম্ভের উপর জোর দিয়েছেন, যা হলো—বিশ্বাস (Faith), পরিবার (Family), বন্ধুত্ব (Friendship) এবং কাজ (Work)। এই স্তম্ভগুলিকে একটি বিনিয়োগ পোর্টফোলিওর মতো দেখা যেতে পারে, কারণ এগুলির বিকাশের জন্য সময় প্রয়োজন। বিশ্বাস বলতে নিজের চেয়ে বৃহত্তর কোনো ঐশ্বরিক শক্তির সাথে সংযোগ স্থাপনকে বোঝায়, যা ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে অন্যদের সেবা করার প্রেরণা যোগায়। অন্যদিকে, সন্তুষ্টি অর্জিত হয় চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করার মাধ্যমে, এবং ব্রুকস এই বিষয়ে সতর্ক করেছেন যে কেবল বস্তুগত জিনিস ক্রয়ের মাধ্যমে প্রাপ্ত সন্তুষ্টি দ্রুত হ্রাস পায়। আনন্দ কেবল নিছক উপভোগ নয়; এটি ভাগ করা অভিজ্ঞতা এবং স্থায়ী স্মৃতির সাথে আনন্দদায়ক মুহূর্তগুলিকে সমৃদ্ধ করার মাধ্যমে অর্জিত হয়, যেখানে সামাজিক মিথস্ক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
আর্থার ব্রুকস পূর্বে আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের প্রেসিডেন্ট হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন এবং তাঁর লেখা একাধিক বেস্টসেলার বই রয়েছে, যার মধ্যে 'দ্য রোড টু ফ্রিডম' (The Road to Freedom) উল্লেখযোগ্য, যা মুক্ত উদ্যোগের নৈতিক প্রতিরক্ষা নিয়ে আলোচনা করে। তাঁর এই বিশ্লেষণগুলি প্রমাণ করে যে ব্যক্তিগত সুখের কাঠামোটি সুচিন্তিত সিদ্ধান্ত এবং অভ্যাসের উপর ভিত্তি করে তৈরি করা সম্ভব, যা জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে গভীর প্রভাব ফেলে এবং সামগ্রিক সুস্থতা পুনরুদ্ধার করতে সহায়তা করে।




