বিজ্ঞানীদের দীর্ঘদিনের একটি প্রচলিত ধারণা ছিল যে, স্তন্যপায়ী প্রাণীদের শরীরের ওজনের তুলনায় মস্তিষ্কের আকার যত বড় হয়, তাদের বুদ্ধিমত্তাও তত বেশি হয়ে থাকে। বন্য প্রাণীদের ক্ষেত্রে এই নিয়মটি সাধারণত সঠিক বলে প্রমাণিত হলেও গৃহপালিত কুকুরের ক্ষেত্রে চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে যে, মানুষের দ্বারা পরিকল্পিত প্রজনন বা সিলেক্টিভ ব্রিডিংয়ের ফলে গৃহপালিত কুকুরদের ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের আয়তন এবং বুদ্ধিবৃত্তিক দক্ষতার মধ্যে কোনো সরাসরি সম্পর্ক নেই। এই আবিষ্কারটি গৃহপালিত প্রজাতির বুদ্ধিমত্তা পরিমাপের প্রচলিত পদ্ধতিগুলোকে নতুন করে ভাবিয়ে তুলছে।
একদল আন্তর্জাতিক গবেষক ১৭২টি ভিন্ন জাতের ১,৬০০টিরও বেশি কুকুরের মাথার খুলি নিয়ে এক বিস্তারিত বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ চালিয়েছেন। মন্টপেলিয়ার বিশ্ববিদ্যালয় এবং জুরিখ বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো স্বনামধন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গবেষকরা এই গবেষণায় অংশ নেন। তারা প্রাণীর শরীরের আকারের তুলনায় মস্তিষ্কের আকার নিখুঁতভাবে পরিমাপ করার জন্য 'রিলেটিভ এন্ডোক্রানিয়াল ভলিউম' (REV) নামক একটি বিশেষ সূচক ব্যবহার করেছেন। 'বায়োলজি লেটারস' (Biology Letters) নামক বিজ্ঞান সাময়িকীতে প্রকাশিত এই গবেষণার ফলাফল কুকুরের জাতের কাজ এবং তাদের আচরণগত বৈশিষ্ট্যের মধ্যে এক বিস্ময়কর ও অপ্রত্যাশিত সম্পর্ক উন্মোচন করেছে।
গবেষণার ফলাফলে দেখা গেছে যে, যেসব কুকুরের কাজের জন্য উচ্চমাত্রার আত্মনিয়ন্ত্রণ, শারীরিক সহনশীলতা এবং জটিল বুদ্ধিবৃত্তিক দক্ষতার প্রয়োজন হয়, তাদের REV বা আপেক্ষিক মস্তিষ্কের আয়তন তুলনামূলকভাবে বেশ কম। উদাহরণস্বরূপ, গবাদি পশু চরানো বা অনুসন্ধান ও উদ্ধারকাজে নিয়োজিত রটওয়াইলার (Rottweiler) বা সাইবেরিয়ান হাস্কি (Siberian Husky)-র মতো জাতগুলোর মস্তিষ্কের আপেক্ষিক আয়তন শরীরের তুলনায় সবচেয়ে কম পাওয়া গেছে। এই পর্যবেক্ষণটি ইঙ্গিত দেয় যে, তাদের অসামান্য কর্মদক্ষতা মস্তিষ্কের বিশাল আয়তনের ওপর নয়, বরং তাদের স্নায়ুতন্ত্রের আরও দক্ষ, বিশেষায়িত এবং সুসংগঠিত বিন্যাসের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে।
এর ঠিক বিপরীতে, চিহুয়াহুয়া (Chihuahua) এবং পোমেরানিয়ান (Pomeranian)-এর মতো ছোট ও শৌখিন জাতের কুকুরগুলো, যাদের মূলত মানুষের সঙ্গী হিসেবে থাকার জন্য প্রজনন করা হয়েছে, তাদের আপেক্ষিক মস্তিষ্কের আয়তন সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে। গবেষণায় আরও উঠে এসেছে যে, উচ্চ REV সম্পন্ন এই জাতগুলো প্রায়ই কিছু নির্দিষ্ট আচরণগত বৈশিষ্ট্য প্রদর্শন করে, যেমন মালিকের থেকে বিচ্ছিন্ন হলে অতিরিক্ত উদ্বেগ বা সেপারেশন অ্যাংজাইটি, ভীরুতা এবং মানুষের মনোযোগ আকর্ষণের তীব্র প্রবণতা। এটি প্রমাণ করে যে, সামাজিক মিথস্ক্রিয়ার জন্য প্রজনন করার ফলে বিবর্তনীয় ধারাটি এমন কিছু আচরণের দিকে ধাবিত হয়েছে যার জন্য সামগ্রিক মস্তিষ্কের আয়তন বড় হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না।
গবেষণায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে যে, আধুনিক গৃহপালিত কুকুরের মস্তিষ্ক তাদের আদি পূর্বপুরুষ ধূসর নেকড়ের তুলনায় গড়ে প্রায় ২০ শতাংশ ছোট। এই সংকোচন প্রক্রিয়াটি গৃহপালিতকরণের একেবারে শুরুর দিকেই শুরু হয়েছিল, যা প্রায় ২৫,০০০ বছর আগেকার ঘটনা বলে গবেষকরা মনে করেন। তবে আধুনিক জাতের কুকুরগুলোর ক্ষেত্রে দেখা গেছে যে, নগরায়ন এবং ক্রমবর্ধমান জটিল সামাজিক পরিবেশের কারণে তাদের মস্তিষ্কের আকার প্রাচীন জাতের তুলনায় কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে। ইওটভোস লোরান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের (Eötvös Loránd University) গবেষক এনিকো কুবিনি (Enikő Kubinyi) মনে করেন যে, মানুষের তৈরি জটিল পরিবেশ এবং মানুষের পক্ষ থেকে আসা নানাবিধ চাহিদাই আধুনিক জাতের কুকুরদের মস্তিষ্কের এই বৃদ্ধিতে উদ্দীপনা জুগিয়েছে।
পরিশেষে বলা যায়, মানুষের সরাসরি প্রভাবে বিবর্তনের ফলে কুকুরের মস্তিষ্কের অভ্যন্তরীণ গঠনে এক গভীর ও সুদূরপ্রসারী পরিবর্তন এসেছে। এই গবেষণার মাধ্যমে এটি স্পষ্ট হয়েছে যে, মস্তিষ্কের পরম আকারের চেয়ে কার্যকরী বিশেষায়নই কোনো নির্দিষ্ট কাজ সফলভাবে সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে মূল ভূমিকা পালন করে। কুকুরের শেখার ক্ষমতা বা নতুন পরিবেশে মানিয়ে নেওয়ার দক্ষতা সরাসরি তাদের মস্তিষ্কের আপেক্ষিক আয়তনের ওপর নির্ভর করে না, বরং তাদের স্নায়বিক নেটওয়ার্কের কার্যকারিতার ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হয়।




