ন্যাশনাল অ্যারোনটিক্স অ্যান্ড স্পেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (NASA) এবং মার্কিন জ্বালানি দপ্তর (DOE) আনুষ্ঠানিকভাবে একটি কৌশলগত সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছে, যার লক্ষ্য চাঁদের পৃষ্ঠে এবং পরবর্তীতে মঙ্গল গ্রহে ব্যবহারের জন্য একটি উন্নত পারমাণবিক বিভাজন বা ফিশন সিস্টেম তৈরি করা। এই উদ্যোগটি ২০৩০ সালের মধ্যে চাঁদে একটি কার্যকর পারমাণবিক চুল্লি স্থাপনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, যা সেখানে মানুষের দীর্ঘমেয়াদী ও টেকসই উপস্থিতির জন্য অপরিহার্য। মহাকাশ বিজ্ঞানীদের মতে, চাঁদের দুই সপ্তাহব্যাপী দীর্ঘ ও শীতল রাতের সময় সৌর শক্তি কোনো কাজে আসে না। এমতাবস্থায়, বেস ক্যাম্প এবং বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি সচল রাখতে পারমাণবিক শক্তিই একমাত্র নির্ভরযোগ্য এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের উৎস হিসেবে গণ্য হচ্ছে।
এই নতুন চুক্তির অধীনে প্রায় ১০০ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন একটি সিস্টেম তৈরির লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে, যা প্রাথমিক পরিকল্পনার ৪০ কিলোওয়াট লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী। নাসার ভারপ্রাপ্ত প্রধান শন ডাফি এই প্রকল্পের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন যে, যে দেশ প্রথম চাঁদে এই ধরনের পারমাণবিক শক্তি ব্যবস্থা স্থাপন করতে পারবে, তারা কৌশলগতভাবে অনেক এগিয়ে থাকবে। বিশেষ করে চীন এবং রাশিয়ার মতো দেশগুলো যখন ২০৩০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে তাদের নিজস্ব চন্দ্র পারমাণবিক কেন্দ্র স্থাপনের জন্য কাজ করছে, তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপ অত্যন্ত সময়োপযোগী। নাসার সাবেক উপ-প্রধান ভব্য লাল এই সহযোগিতাকে ঐতিহাসিক 'ম্যানহাটন প্রজেক্ট'-এর চেতনার সাথে তুলনা করেছেন, যা মহাকাশ গবেষণার ক্ষেত্রে একটি বড় ধরনের বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির ইঙ্গিত দেয়।
দীর্ঘমেয়াদী এই জ্বালানি পরিকল্পনার পাশাপাশি, নাসা তাদের বহুল প্রতীক্ষিত আর্টেমিস প্রোগ্রামের মানববাহী মিশনগুলোর জন্য একটি পরিমার্জিত এবং বাস্তবসম্মত সময়সূচি প্রকাশ করেছে। আর্টেমিস-২ মিশন, যা ১৯৭২ সালের অ্যাপোলো-১৭ অভিযানের পর চাঁদের অভিমুখে প্রথম মানববাহী যাত্রা হতে যাচ্ছে, তার উৎক্ষেপণ এখন ২০২৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারির আগে সম্ভব নয় বলে জানানো হয়েছে। ১০ দিনের এই বিশেষ অভিযানে নভোচারী রিড ওয়াইজম্যান, ভিক্টর গ্লোভার, ক্রিস্টিনা কোচ এবং জেরেমি হ্যানসেন ওরিয়ন মহাকাশযানে করে চাঁদের কক্ষপথ প্রদক্ষিণ করবেন। এই মিশনের মূল উদ্দেশ্য হলো গভীর মহাকাশে মানুষের জীবন রক্ষাকারী ব্যবস্থাগুলোর কার্যকারিতা যাচাই করা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১৭ জানুয়ারির মধ্যে কেপ ক্যানাভেরালে লঞ্চ কমপ্লেক্স ৩৯বি-তে স্পেস লঞ্চ সিস্টেম (SLS) রকেট এবং ওরিয়ন মহাকাশযানকে নিয়ে আসার প্রস্তুতি চলছে।
তবে আর্টেমিস-৩ মিশন, যা চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে নভোচারীদের অবতরণ করানোর কথা ছিল, তা উল্লেখযোগ্য প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জের কারণে বিলম্বিত হয়েছে। এই মিশনের নতুন লক্ষ্যমাত্রা এখন ২০২৭ সালের মাঝামাঝি বা তার পরে নির্ধারণ করা হয়েছে। এই বিলম্বের পেছনে প্রধানত ওরিয়ন মহাকাশযানের হিট শিল্ড বা তাপ সুরক্ষা বর্মের সমস্যা দায়ী, যা আর্টেমিস-১ মিশনের সময় বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের সময় অপ্রত্যাশিতভাবে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছিল। এছাড়া, স্পেসএক্স-এর স্টারশিপ-ভিত্তিক হিউম্যান ল্যান্ডিং সিস্টেম (HLS) তৈরির কাজও প্রত্যাশিত গতিতে এগোচ্ছে না। বিশেষ করে পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথে ক্রায়োজেনিক জ্বালানি স্থানান্তরের মতো জটিল প্রযুক্তিগত ধাপগুলো সম্পন্ন করতে দেরি হওয়ায় মার্কিন সরকারি জবাবদিহি দপ্তর (GAO) উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। কিছু বিশেষজ্ঞের মতে, এই অবতরণ ২০২৮ সাল পর্যন্ত পিছিয়ে যেতে পারে।
সামগ্রিকভাবে, নাসা এবং মার্কিন জ্বালানি দপ্তরের এই যৌথ প্রয়াস কেবল চাঁদে বিদ্যুৎ সরবরাহের সমাধান নয়, বরং এটি মহাকাশ গবেষণায় মার্কিন শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখার একটি বড় লড়াই। যদিও প্রকৌশলগত জটিলতা এবং নিরাপত্তার খাতিরে আর্টেমিস মিশনের সময়সূচিতে পরিবর্তন আনা হয়েছে, তবুও ২০৩০ সালের মধ্যে পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারের লক্ষ্যটি স্থির রয়েছে। এই প্রযুক্তি সফল হলে তা কেবল চাঁদে নয়, বরং ভবিষ্যতে মঙ্গল গ্রহে মানুষের বসতি স্থাপনের স্বপ্নকেও বাস্তবে রূপ দিতে সহায়ক হবে। আন্তর্জাতিক মহাকাশ প্রতিযোগিতার এই নতুন যুগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবন এবং কৌশলগত অংশীদারিত্বের মাধ্যমে এক নতুন মাইলফলক স্পর্শ করতে চায়।




