বিশ্বব্যাপী কৃষি সংরক্ষণের এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে, নরওয়ের সুদূর আর্কটিক অঞ্চলে অবস্থিত স্বালবার্ড গ্লোবাল সিড ভল্টে প্রথমবারের মতো জলপাই বীজের নমুনা আনুষ্ঠানিকভাবে জমা দেওয়া হয়েছে। এই সংরক্ষণ কার্যক্রমটি জলপাই প্রজাতির জিনগত বৈচিত্র্যকে সুরক্ষিত করার লক্ষ্যে পরিচালিত, যা জলবায়ু পরিবর্তনের মতো ক্রমবর্ধমান হুমকির মুখে অত্যন্ত জরুরি। এই ঐতিহাসিক পদক্ষেপটি মূলত ইউরোপীয় গবেষণা প্রকল্প GEN4OLIVE-এর একটি প্রধান সাফল্য, যা কর্ডোবা বিশ্ববিদ্যালয় দ্বারা পরিচালিত হয়েছিল এবং এতে আন্তর্জাতিক জলপাই পরিষদ (IOC) ও জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO) সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিল।
GEN4OLIVE প্রকল্পটি এই গুরুত্বপূর্ণ বীজ জমার কাজটি সমন্বয় করেছে, যেখানে কর্ডোবা বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্বে ৫০টি প্রধান চাষ করা জলপাই জাত এবং বন্য নমুনার সংরক্ষণ নিশ্চিত করা হয়েছে। প্রকল্পটি জলপাইয়ের জিনগত সম্পদকে (GenRes) আরও সহজলভ্য করার এবং প্রজননকারীদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য কাজ করছে, বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তন, কীটপতঙ্গ ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা, উৎপাদন এবং আধুনিক রোপণ পদ্ধতির মতো পাঁচটি মূল বিষয়ের ওপর জোর দিয়ে। এই উদ্যোগটি জলপাইয়ের হাজার হাজার বছরের নির্বাচিত বৈচিত্র্যকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, সংঘাত বা বৈশ্বিক সংকট থেকে ব্যবহারিক সুরক্ষা প্রদান করে, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম জলপাই তেল এবং এর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য উপভোগ করতে পারে।
স্বালবার্ড গ্লোবাল সিড ভল্ট, যা কখনও কখনও 'ডুমসডে ভল্ট' নামেও পরিচিত, এটি পৃথিবীর বৃহত্তম বীজ সংরক্ষণাগার, যা কৃষি বীজের দীর্ঘমেয়াদী সংরক্ষণের জন্য নিবেদিত। এই ভল্টটি নরওয়ের স্পিটসবার্গেন দ্বীপের একটি পর্বতের গভীরে, পারমাফ্রস্টের নিচে -১৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় বীজ সংরক্ষণ করে, যা প্রাকৃতিক হিমায়নের মাধ্যমে একটি ব্যয়-সাশ্রয়ী এবং ব্যর্থতা-রোধী পদ্ধতি প্রদান করে। ভল্টটির ধারণক্ষমতা ৪.৫ মিলিয়ন বীজ নমুনার, যার মধ্যে প্রতিটি প্যাকেটে গড়ে ৫০০টি বীজ থাকে, যা এটিকে বৈশ্বিক খাদ্য সরবরাহের ভিত্তি সুরক্ষিত করার জন্য একটি বীমা পলিসি হিসেবে কাজ করে।
এই ৬৯তম জমা দেওয়ার মাধ্যমে, ভল্টে সংরক্ষিত মোট বীজের সংখ্যা ১,৩৮৬,১০২-এ পৌঁছেছে, যেখানে গুয়াতেমালা এবং নাইজারের মতো দুটি নতুন দেশের বীজও প্রথমবারের মতো জমা পড়েছে। জলপাইয়ের জিনগত বৈচিত্র্য সংরক্ষণ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ কারণ বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এর চাষ হুমকির মুখে। গবেষণায় দেখা গেছে যে তাপমাত্রা পরিবর্তন এবং অনিয়মিত বৃষ্টিপাতের কারণে জলপাই গাছের ফুল ফোটার সময় প্রভাবিত হচ্ছে, যা পরাগায়ন চক্রকে ব্যাহত করতে পারে এবং ফলন হ্রাস করতে পারে। ইন্টারন্যাশনাল অলিভ কাউন্সিলের মতে, স্থানীয় জলপাই জাতগুলি গাছের বার্ধক্য, ঐতিহ্যবাহী জলপাই বাগানের কম লাভজনকতা এবং সহজে যান্ত্রিকীকরণযোগ্য উন্নত জাতের প্রসারের কারণে বিপন্ন।
GEN4OLIVE প্রকল্পের অংশ হিসেবে, কর্ডোবা বিশ্ব জলপাই জার্মপ্লাজম ব্যাঙ্ক (BGMO-UCO) আন্তর্জাতিক চুক্তি অন প্ল্যান্ট জেনেটিক রিসোর্সেস ফর ফুড অ্যান্ড এগ্রিকালচারের কাঠামোর অধীনে আনুষ্ঠানিকভাবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এই সংরক্ষণের মাধ্যমে, স্পেনের কর্ডোবা বিশ্ববিদ্যালয় এবং গ্রানাডা বিশ্ববিদ্যালয় যৌথভাবে কাজ করেছে, যেখানে কর্ডোবা থেকে চাষ করা জাত এবং গ্রানাডা থেকে বন্য জলপাই গাছের নমুনা নির্বাচন করা হয়েছে। ইনস্টিটিউট ফর বায়োইকোনমির প্রধান ক্লডিও ক্যান্টিনি উল্লেখ করেছেন যে জলপাই জীববৈচিত্র্যকে আরও ভালোভাবে চিহ্নিত ও ব্যবহার করার মাধ্যমে ভবিষ্যতের নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব হবে। এই পদক্ষেপটি হাজার হাজার বছর ধরে নির্বাচিত জলপাই বৈচিত্র্যের একটি ব্যবহারিক সুরক্ষা।



