খগোলবিদরা ইতিহাসে প্রথমবার সূর্যের বাইরের সীমানার একটি মানচিত্র তৈরি করেছেন — একটি গতিশীল সীমানা যেখানে সৌর বাতাস সূর্যের চৌম্বক আকর্ষণ থেকে মুক্ত হয়ে সৌরজগত জুড়ে যাত্রা শুরু করে।
নাসার স্বয়ংক্রিয় মহাকাশযান ‘পার্কার সোলার প্রোব’ থেকে প্রাপ্ত তথ্যের নতুন পর্যায়ের বিশ্লেষণ বিজ্ঞানীদের সৌর করোনার বাইরের সীমানা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ নতুন ধারণা দিয়েছে। এই সীমানাটি ‘আলফভেন সারফেস’ নামে পরিচিত। এটি এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ, যেখানে সূর্য থেকে নির্গত পদার্থের গতি আলফভেন গতিকে অতিক্রম করে যায়। এর পরেই কণাগুলি অনিয়ন্ত্রিতভাবে সৌর বায়ু রূপে আন্তঃগ্রহীয় মহাকাশে ছড়িয়ে পড়ে। সূর্যমণ্ডলীয় পদার্থবিদ্যার অন্যতম প্রধান রহস্য হলো এই করোনা, যা সূর্যের বায়ুমণ্ডলের সবচেয়ে হালকা ও উষ্ণতম স্তর। এটি লক্ষ লক্ষ কিলোমিটার বিস্তৃত এবং এর তাপমাত্রা প্রায় দশ লক্ষ কেলভিন পর্যন্ত পৌঁছায়।
একটি স্পেসক্র্যাফট 690 000 কিমি/ঘণ্টা বেগে ছুটছে — এটি আলোউপস্থিতির 0,064% এর সমান, ফলে NASA–র Parker Solar Probe মানব-নির্মিত সবচেয়ে দ্রুত বস্তু হিসেবে পরিচিত।
হার্ভার্ড-স্মিথসোনিয়ান সেন্টার ফর অ্যাস্ট্রোফিজিক্স (CfA)-এর জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানী স্যাম ব্যাডম্যান সহ গবেষকরা সরাসরি করোনার মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় প্রোব দ্বারা সংগৃহীত তথ্য ব্যবহার করেছেন। যদিও এই বায়ুমণ্ডলীয় প্রান্তটি স্বভাবতই পরিবর্তনশীল এবং প্রতিনিয়ত রূপ বদলায়, তবুও, বিশেষত 2025 সালের প্রকাশনাগুলিতে, যেমন ‘অ্যাস্ট্রোফিজিক্যাল জার্নাল লেটার্স’-এ উপস্থাপিত নতুন তথ্য প্রক্রিয়াকরণ পদ্ধতি এই অস্থির সীমানার প্রথম অবিচ্ছিন্ন দ্বিমাত্রিক মানচিত্র তৈরি করতে সাহায্য করেছে। পার্কারের সরাসরি পরিমাপ দ্বারা যাচাইকৃত এই মানচিত্রগুলি ভবিষ্যতের অনুসন্ধানের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য ভিত্তি স্থাপন করেছে।
তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত ছিল 24 ডিসেম্বর 2024 তারিখে সূর্যের সঙ্গে প্রোবের রেকর্ড দূরত্বে পৌঁছানো। সেই সময় মহাকাশযানটি ফটোস্ফিয়ার থেকে মাত্র ৬.১ মিলিয়ন কিলোমিটার (প্রায় ৩.৮ মিলিয়ন মাইল) দূরত্বে এসেছিল। এর পরবর্তী পেরিগিগুলি, বিশেষত 22 মার্চ এবং 19 জুন 2025 তারিখে, সৌর বায়ু এবং চৌম্বক ক্ষেত্রের গতিশীলতা সম্পর্কে অতিরিক্ত অন্তর্দৃষ্টি প্রদান করেছে। এই অভিযানগুলির সময়, করোনাল মাস ইজেকশন (CME) এবং ‘সুইচব্যাক’ নামে পরিচিত চৌম্বক ক্ষেত্রের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ ‘জিগজ্যাগ’ গতিবিধি রেকর্ড করা সম্ভব হয়েছিল।
এই সীমানার অবস্থান সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করার সরাসরি ব্যবহারিক গুরুত্ব রয়েছে পৃথিবীর প্রযুক্তির ক্ষেত্রে। মহাজাগতিক আবহাওয়ার পূর্বাভাসকে আরও নিখুঁত করতে এই সঠিক মানচিত্রায়ন অত্যন্ত সহায়ক। এর মধ্যে রয়েছে সৌর বায়ুর আকস্মিক ঝলকানি, যা উপগ্রহ ব্যবস্থা এবং স্থলভাগের বিদ্যুৎ গ্রিডগুলির কার্যকারিতাকে প্রভাবিত করতে পারে। উপরন্তু, নতুন তথ্যগুলি করোনার অস্বাভাবিকভাবে উচ্চ তাপমাত্রার ব্যাখ্যা প্রদানকারী মডেলগুলিকে আরও নির্ভুল করতে সাহায্য করছে এবং দুই ধরনের ধীর সৌর বায়ুর অস্তিত্বকে সমর্থন করছে, যেগুলির উৎস সম্ভবত তার বায়ুমণ্ডলের ভিন্ন ভিন্ন স্থান থেকে উদ্ভূত।
যেহেতু সূর্য তার ১১ বছরের চক্রের কার্যকলাপ হ্রাসের পর্যায়ে প্রবেশ করছে, তাই করোনার বহিঃসীমা আরও অনিয়মিত হয়ে উঠছে, যা বর্তমান পর্যবেক্ষণগুলিকে বিশেষভাবে মূল্যবান করে তুলেছে। জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটির অ্যাপ্লায়েড ফিজিক্স ল্যাবরেটরি দ্বারা নকশা করা ‘পার্কার’ মিশন তার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে, এবং নাসা আসন্ন সৌর সর্বনিম্ন অবস্থা পর্যবেক্ষণের লক্ষ্য নিয়ে মিশনের মেয়াদ বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে। এই আবিষ্কারগুলি কেবল আমাদের সূর্য সম্পর্কে ধারণাই প্রসারিত করছে না, বরং অন্যান্য নক্ষত্র এবং তাদের চারপাশে প্রদক্ষিণকারী গ্রহগুলির সম্ভাব্য বাসযোগ্যতার চক্র বোঝার ক্ষেত্রেও নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে।