আমাদের গ্যালাক্সির কেন্দ্রে বিজ্ঞানীরা সালফার-যুক্ত ছয়-সদস্য রিং মলিকিউলটির প্রথমটি আবিষ্কার করেছেন, যা একটি আন্তঃতারা মেঘে লুকিয়ে আছে.
মহাকাশে বৃহত্তম সালফারযুক্ত বলয় অণুর সন্ধান পেলেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা
সম্পাদনা করেছেন: Uliana S.
২০২৬ সালের জানুয়ারিতে মহাকাশ বিজ্ঞানের এক যুগান্তকারী অধ্যায় উন্মোচিত হয়েছে। বিজ্ঞানীরা মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির কেন্দ্রে অবস্থিত G+0.693–0.027 নামক একটি আণবিক মেঘে ২,৫-সাইক্লোহেক্সাডিয়ান-১-থায়ন (C₆H₆S) নামক একটি জটিল সালফারযুক্ত হাইড্রোকার্বনের অস্তিত্ব নিশ্চিত করেছেন। পৃথিবী থেকে প্রায় ২৭,০০০ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত এই অঞ্চলটি মূলত নতুন নক্ষত্র তৈরির একটি সূতিকাগার। ১৩টি পরমাণু নিয়ে গঠিত এই বলয়াকার অণুটি মহাকাশে আবিষ্কৃত এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বিশাল সালফারযুক্ত কাঠামো হিসেবে স্বীকৃত হয়েছে, যা বিজ্ঞানীদের মহাজাগতিক রসায়ন সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।
এই আবিষ্কারটি জ্যোতিঃরসায়নের ক্ষেত্রে একটি দীর্ঘদিনের শূন্যতা পূরণ করেছে। এটি মহাকাশের সাধারণ জৈব রসায়নের সাথে উল্কাপিণ্ড বা ধূমকেতুতে পাওয়া জটিল রাসায়নিক উপাদানের মধ্যে একটি সরাসরি যোগসূত্র স্থাপন করে। সালফার মহাবিশ্বের দশম প্রচুর উপাদান এবং এটি জীবন গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় অ্যামিনো অ্যাসিড, প্রোটিন ও এনজাইমের একটি অপরিহার্য অংশ। এর আগে মহাকাশে প্রাপ্ত সালফার যৌগগুলোতে সাধারণত ছয়টির বেশি পরমাণু দেখা যেত না। তাই ১৩টি পরমাণু বিশিষ্ট এই অণুর সন্ধান পাওয়া গবেষকদের জন্য একটি বিশাল সাফল্য।
এই অণুর অস্তিত্ব নিশ্চিত করতে জার্মানির ম্যাক্স প্লাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর এক্সট্রাটেরেস্ট্রিয়াল ফিজিক্স (MPE) এবং স্পেনের সেন্টার ফর অ্যাস্ট্রোবায়োলজি (CAB) যৌথভাবে কাজ করেছে। ল্যাবরেটরিতে ১০০০ ভোল্টের বৈদ্যুতিক ডিসচার্জ ব্যবহার করে থিওফেনল (C₆H₅SH) থেকে এই যৌগটি কৃত্রিমভাবে তৈরি করা হয়। এরপর স্পেনে অবস্থিত ৩০-মিটারের IRAM এবং ৪০-মিটারের Yebes রেডিও টেলিস্কোপ থেকে প্রাপ্ত তথ্যের সাথে ল্যাবরেটরির বর্ণালী সংকেত মিলিয়ে দেখা হয়। এই নিখুঁত মিল প্রমাণ করে যে মহাকাশে সত্যিই এই জটিল অণুর অস্তিত্ব রয়েছে।
গবেষণার প্রধান বিজ্ঞানী মিতসুনোরি আরাকি এবং সহ-গবেষক ভ্যালেরিও লাত্তানজি মনে করেন, এই আবিষ্কার নিশ্চিত করে যে নক্ষত্র গঠনের অনেক আগেই মহাকাশে জীবনের মৌলিক উপাদানগুলো তৈরি হতে শুরু করেছিল। G+0.693–0.027 অঞ্চলটি রাসায়নিকভাবে অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়, যেখানে এর আগে নাইট্রিল জাতীয় উপাদানের সন্ধান পাওয়া গিয়েছিল। এই নতুন তথ্যটি শীতল পরিবেশে জটিল রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটার সম্ভাবনাকে আরও জোরালো করে তুলেছে। বিজ্ঞানীদের মতে, এই অঞ্চলটি মহাবিশ্বের আদি রসায়ন বোঝার জন্য একটি প্রাকৃতিক গবেষণাগার হিসেবে কাজ করছে।
থিয়েপিনের এই গঠনটি উল্কাপিণ্ডে পাওয়া অণুগুলোর সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ, যা একটি বিশেষ তত্ত্বকে সমর্থন করে। তত্ত্বটি হলো—পৃথিবীতে জীবনের প্রাথমিক উপাদানগুলো সম্ভবত মহাকাশীয় বস্তুর সংঘর্ষের মাধ্যমেই এসেছিল। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে 'নেচার অ্যাস্ট্রোনমি' (Nature Astronomy) জার্নালে এই গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়। একটি ১৩-পরমাণুর বলয়াকার অণুর উপস্থিতি এটাই নির্দেশ করে যে, মহাবিশ্বের বিবর্তনের একেবারে প্রাথমিক ধাপেই জীবনের রাসায়নিক ভিত্তি স্থাপিত হয়ে গিয়েছিল।
ভবিষ্যতে এই ধরনের আরও জটিল সালফারযুক্ত অণু শনাক্ত করার পথ প্রশস্ত করল এই আবিষ্কার। বিজ্ঞানীদের মতে, মহাজাগতিক ধূলিকণা এবং গ্যাসের মেঘের মধ্যে লুকিয়ে থাকা এই রহস্যগুলো উন্মোচনের মাধ্যমে আমরা আমাদের নিজেদের অস্তিত্বের উৎস সম্পর্কে আরও স্বচ্ছ ধারণা পাব। এই গবেষণাটি কেবল রসায়নের সাফল্য নয়, বরং এটি মহাবিশ্বের বিশালতায় প্রাণের বীজ কীভাবে ছড়িয়ে আছে, তা বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
উৎসসমূহ
Tribuna do Sertão
Max-Planck-Gesellschaft
Universe Today
The Brighter Side of News