EHT টেলিস্কোপ ব্যবহার করে, পৃথিবীর আয়তনের সমান একটি একক টেলিস্কোপ হিসেবে কাজ করা বৈশ্বিক রেডিও টেলিস্কোপ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা ব্ল্যাক হোলের খুব কাছে অবস্থিত অঞ্চলটি অধ্যয়ন করেছেন।
অ্যাস্ট্রোনমারদের আন্তর্জাতিক জোট ইভেন্ট হরাইজন টেলিস্কোপ (EHT) মহাকাশ বিজ্ঞানে এক নতুন মাইলফলক স্পর্শ করেছে। তারা সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাক হোল M87* থেকে নির্গত বিশাল গ্যাসীয় জেট বা কণা প্রবাহের সঠিক উৎসস্থলটি অত্যন্ত নির্ভুলভাবে চিহ্নিত করতে সক্ষম হয়েছেন। ২০২১ সালে সংগৃহীত তথ্যের গভীর ও সূক্ষ্ম বিশ্লেষণের মাধ্যমে গবেষকরা এই শক্তিশালী চার্জযুক্ত কণা প্রবাহের জন্মস্থান সম্পর্কে এমন কিছু পর্যবেক্ষণমূলক প্রমাণ পেয়েছেন যা আগে কখনও সম্ভব হয়নি।
একটি নতুন গবেষণায়, EHT-র বিজ্ঞানীদের একটি দল ২০২১ সালের নতুন তথ্য ব্যবহার করে জেট-শুরুর অঞ্চলের অস্তিত্বের প্রমাণ পেয়েছে।
পৃথিবী থেকে প্রায় ৫৫ মিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত মেসিয়ার ৮৭ (M87) গ্যালাক্সির কেন্দ্রে এই দানবীয় ব্ল্যাক হোলটির অবস্থান। আগে এই জেটের গোড়াটি ব্ল্যাক হোলের রহস্যময় 'ছায়া'র আড়ালে ঢাকা থাকলেও, নতুন উন্নত ডেটাসেটের মাধ্যমে তা এখন বিজ্ঞানীদের কাছে দৃশ্যমান হয়েছে। বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, এই জেটটি মহাকাশে প্রায় ৩০০০ আলোকবর্ষ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে গ্যালাক্সির গঠনকে প্রভাবিত করে। তবে এর নব-আবিষ্কৃত উৎপত্তিস্থলটি ব্ল্যাক হোল থেকে মাত্র ০.০৯ আলোকবর্ষ বা এক আলোকবর্ষের দশ ভাগের এক ভাগেরও কম দূরত্বের মধ্যে অবস্থিত, যা মহাজাগতিক স্কেলে অত্যন্ত নিকটবর্তী।
এই যুগান্তকারী গবেষণায় নেতৃত্ব দিয়েছেন ম্যাক্স প্লাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর রেডিও অ্যাস্ট্রোনমি (MPIfR)-এর গবেষক দলের প্রধান সৌরভ এবং ন্যাশনাল রেডিও অ্যাস্ট্রোনমি অবজারভেটরি (NRAO)-এর বিশিষ্ট সদস্য হেনড্রিক মুলার। এছাড়া বর্তমানে কানাডিয়ান ইনস্টিটিউট ফর থিওরিটিক্যাল অ্যাস্ট্রোফিজিক্স (CITA)-এর সাথে যুক্ত সেবাস্টিয়ানো ফন ফেলেনবার্গও এই গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। তাদের এই গবেষণার ফলাফলগুলো সম্প্রতি বিখ্যাত 'অ্যাস্ট্রোনমি অ্যান্ড অ্যাস্ট্রোফিজিক্স' (Astronomy & Astrophysics) জার্নালে বিস্তারিতভাবে প্রকাশিত হয়েছে। গবেষক দলটি এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে, ২০২১ সালের তথ্যে ধরা পড়া রেডিও বিকিরণটি ব্ল্যাক হোলের একদম নিকটবর্তী একটি কম্প্যাক্ট অঞ্চল থেকে নির্গত হচ্ছে, যা জেটের গোড়া হিসেবে চিহ্নিত।
উল্লেখ্য যে, M87* হলো ইতিহাসের প্রথম ব্ল্যাক হোল যার ছবি ২০১৯ সালের এপ্রিলে ২০১৭ সালের তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশ করা হয়েছিল। এই ব্ল্যাক হোলটির ভর সূর্যের ভরের তুলনায় প্রায় ৬.৫ বিলিয়ন গুণ বেশি, যা একে মহাবিশ্বের অন্যতম বৃহৎ বস্তুতে পরিণত করেছে। আমাদের নিজস্ব মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির কেন্দ্রে থাকা ব্ল্যাক হোল 'স্যাজিটেরিয়াস এ*' (Sgr A*)-এর ভর যেখানে মাত্র ৪ মিলিয়ন সৌর ভরের সমান, সেখানে M87*-এর বিশালত্ব এবং শক্তি সহজেই অনুমেয়। এই গবেষণার জন্য 'ভেরি লং বেসলাইন ইন্টারফেরোমেট্রি' (VLBI) নামক একটি বিশেষ পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে, যা শোয়ার্জশিল্ড ব্যাসার্ধের (Schwarzschild radius) কাছাকাছি থাকা সূক্ষ্ম কাঠামোকেও আলাদাভাবে শনাক্ত করতে পারে।
গবেষণার সংবেদনশীলতা এবং নির্ভুলতা বাড়াতে এবার NOEMA এবং কিট পিকে অবস্থিত ১২ মিটারের টেলিস্কোপের মতো নতুন ও শক্তিশালী সরঞ্জাম ব্যবহার করা হয়েছে। এই প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের ফলেই ০.০২ থেকে ০.০২ পারসেক স্কেলের কাঠামো বিশ্লেষণ করা সম্ভব হয়েছে এবং ব্ল্যাক হোল থেকে মাত্র ০.০৯ আলোকবর্ষ দূরত্বের রহস্য উন্মোচিত হয়েছে। এটি EHT কোলাবরেশনের ক্রমবর্ধমান সক্ষমতার একটি বড় প্রমাণ। তাত্ত্বিক মডেল অনুযায়ী, ব্ল্যান্ডফোর্ড-জেনাজেক (BZ) প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ব্ল্যাক হোলের ঘূর্ণন শক্তি এবং ইভেন্ট হরাইজন অতিক্রমকারী চৌম্বক ক্ষেত্রের প্রভাবে এই শক্তিশালী জেটের সৃষ্টি হয়।
ভবিষ্যতে আরও বিস্তারিত পর্যবেক্ষণের পরিকল্পনা রয়েছে গবেষক দলটির, যা এই ফলাফলগুলোকে আরও দৃঢ়ভাবে নিশ্চিত করবে। এই আবিষ্কার কেবল M87* সম্পর্কে আমাদের জ্ঞানকে সমৃদ্ধ করেনি, বরং মহাবিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী শক্তির উৎসগুলো কীভাবে কাজ করে তা বোঝার ক্ষেত্রেও নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। এই ধরনের গ্যালাকটিক জেটের উৎক্ষেপণের মৌলিক রহস্য সমাধানের পথে এটি একটি বিশাল পদক্ষেপ। ইভেন্ট হরাইজন টেলিস্কোপ কোলাবরেশনের এই সাফল্য ভবিষ্যতে ব্ল্যাক হোল এবং জেটের মধ্যকার জটিল সম্পর্ক ব্যাখ্যা করতে এবং মহাকাশ বিজ্ঞানের নতুন নতুন রহস্য উন্মোচনে সহায়ক হবে।