বৃহস্পতি আমাদের আগে ভাবা থেকে একটু ছোট এবং আরও সমতল।
নাসার মহাকাশযান 'জুনো' (Juno) বৃহস্পতি গ্রহের আকার সম্পর্কে অত্যন্ত নির্ভুল তথ্য প্রদান করেছে, যা এই গ্যাস দানব সম্পর্কে আমাদের দীর্ঘদিনের ধারণাকে আমূল বদলে দিচ্ছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির শুরুতে 'নেচার অ্যাস্ট্রোনমি' (Nature Astronomy) জার্নালে প্রকাশিত একটি নতুন বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বৃহস্পতি গ্রহটি আসলে আমাদের গত ৫০ বছরের ধারণার চেয়ে কিছুটা ছোট এবং এর মেরু অঞ্চলগুলো আগের ধারণার চেয়েও বেশি চ্যাপ্টা। এই নতুন জ্যামিতিক পরিমাপগুলো গ্রহবিজ্ঞান এবং বৃহস্পতির অভ্যন্তরীণ গঠন বোঝার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।
গত পাঁচ দশক ধরে বিজ্ঞানীরা ১৯৭০-এর দশকে পাঠানো 'পায়োনিয়ার-১০' (Pioneer-10), 'ভয়েজার-১' (Voyager-1) এবং 'ভয়েজার-২' (Voyager-2) মহাকাশযানের দেওয়া তথ্যের ওপর ভিত্তি করে বৃহস্পতির মডেল তৈরি করেছিলেন। তবে সেই প্রাথমিক মিশনগুলো বৃহস্পতির শক্তিশালী বায়ুপ্রবাহ বা জোনাল উইন্ডের প্রভাব পুরোপুরি বিবেচনা করতে পারেনি, যার ফলে গণনায় কিছু সূক্ষ্ম ত্রুটি থেকে গিয়েছিল। ২০১৬ সাল থেকে বৃহস্পতির কক্ষপথে থাকা 'জুনো' মহাকাশযানটি ২০২১ সালে এর মিশন পুনর্গঠনের পর একটি বিশেষ দীর্ঘায়িত কক্ষপথ ব্যবহার করে এই পরিমাপে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে। এই পরিবর্তিত কক্ষপথ বিজ্ঞানীদের গ্রহের বায়ুমণ্ডলের মধ্য দিয়ে যাওয়া রেডিও সংকেতের বিচ্যুতিগুলো অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণ করতে সাহায্য করেছে, যা অনেকটা কম্পিউটেড টমোগ্রাফি বা সিটি স্ক্যানের মতো কাজ করে।
উইজম্যান ইনস্টিটিউটের (Weizmann Institute) বিজ্ঞানীদের নেতৃত্বে একটি আন্তর্জাতিক গবেষণা দল এই নতুন তথ্যগুলো বিশ্লেষণ করেছে। তাদের গবেষণায় দেখা গেছে যে, বৃহস্পতির বিষুবীয় ব্যাস এবং মেরু অঞ্চলের সংকোচন আগের ধারণার চেয়ে ভিন্ন। ১ বার (1 bar) বায়ুমণ্ডলীয় চাপের স্তরে বৃহস্পতির বিষুবীয় ব্যাস আগের অনুমানের চেয়ে প্রায় ৮ কিলোমিটার কম পাওয়া গেছে। অন্যদিকে, এর মেরু ব্যাসার্ধ ১২ থেকে ২৪ কিলোমিটার পর্যন্ত কম বলে প্রমাণিত হয়েছে, যা মেরু অঞ্চলে গ্রহটির অধিকতর সংকোচনের প্রমাণ দেয়। উইজম্যান ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ইয়োহাই কাস্পি (Yohai Kaspi) উল্লেখ করেছেন যে, ২৬টি নতুন পরিমাপের ওপর ভিত্তি করে তৈরি এই তথ্যগুলো গ্রহের আকৃতি নির্ধারণের অনিশ্চয়তাকে আগের তুলনায় দশগুণ কমিয়ে এনেছে।
২০২৬ সালের ২ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত এই পরিমার্জিত তথ্যানুযায়ী, ১ বার চাপে বৃহস্পতির বিষুবীয় ব্যাসার্ধ হলো ৭১,৪৮৮ কিলোমিটার এবং মেরু ব্যাসার্ধ হলো ৬৬,৮৪২ কিলোমিটার। বায়ুপ্রবাহের কারণে কেন্দ্রাতিগ শক্তিতে যে ১০ কিলোমিটারের মতো তারতম্য ঘটে, তা বিবেচনায় নিয়ে বিজ্ঞানীরা মহাকর্ষীয় এবং বায়ুমণ্ডলীয় তথ্যের মধ্যে সামঞ্জস্য আনতে সক্ষম হয়েছেন। সৌরজগতের সবচেয়ে বিশাল গ্রহ হিসেবে বৃহস্পতি অন্যান্য গ্রহের কক্ষপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই নতুন পরিমাপগুলো 'হট জুপিটার' (Hot Jupiter) জাতীয় বহির্গ্রহের মডেলিং করার ক্ষেত্রে একটি আদর্শ মানদণ্ড হিসেবে কাজ করবে এবং গ্রহের অভ্যন্তরীণ কাঠামোর মডেলগুলোকে পর্যবেক্ষণের সাথে আরও নির্ভুলভাবে মেলাতে সাহায্য করবে।
এই আবিষ্কারটি কেবল বৃহস্পতির আকার পরিবর্তনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি মহাকাশ গবেষণার প্রযুক্তির উৎকর্ষতাকেও নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেছে। জুনো মিশনের এই সাফল্য প্রমাণ করে যে, দীর্ঘমেয়াদী মিশনগুলো কীভাবে সময়ের সাথে সাথে আরও উন্নত এবং সূক্ষ্ম তথ্য প্রদান করতে পারে। বিজ্ঞানীদের মতে, এই নতুন তথ্যগুলো ভবিষ্যতে বৃহস্পতির মতো অন্যান্য গ্যাসীয় গ্রহগুলোর বিবর্তন এবং তাদের বায়ুমণ্ডলীয় গতিপ্রকৃতি বুঝতে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে, যা মহাবিশ্বের সৃষ্টিতত্ত্ব গবেষণায় সহায়ক হবে।