আন্ড্রোমেডা গ্যালাক্সির নিকটবর্তী ప్రాంతে জ্যোতিবিজ্ঞানীরা বিশাল আকৃতির নক্ষত্র M31 2014 DS1–কে পর্যবেক্ষণ করেন, যা প্রথমে 2014 সালে উজ্জ্বল হলো এবং পরে দৃশ্যমান আলো থেকে সম্পূর্ণভাবে গায়েব হয়ে যায়। (শিল্পিত চিত্র)
আন্তর্জাতিক জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের একটি দল একটি বিশাল নক্ষত্রের সরাসরি কৃষ্ণগহ্বর বা ব্ল্যাক হোলে রূপান্তরের অকাট্য প্রমাণ উপস্থাপন করেছেন। সাধারণত নক্ষত্রের বিবর্তনের শেষ পর্যায়ে সুপারনোভা নামক এক বিশাল বিস্ফোরণ ঘটে, কিন্তু এই বিরল ক্ষেত্রে কোনো বিস্ফোরণ ছাড়াই সরাসরি মহাকর্ষীয় পতনের মাধ্যমে কৃষ্ণগহ্বরটি তৈরি হয়েছে। পৃথিবী থেকে প্রায় ২৫ লক্ষ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত প্রতিবেশী অ্যান্ড্রোমিডা গ্যালাক্সিতে 'M31-2014-DS1' নামক এই মহাজাগতিক ঘটনাটি পর্যবেক্ষণ করা হয়। প্রায় দুই দশকের দীর্ঘ পর্যবেক্ষণের তথ্য বিশ্লেষণ করে এই গবেষণাপত্রটি ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি বিশ্বখ্যাত 'সায়েন্স' (Science) সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে।
ফ্ল্যাটিরন ইনস্টিটিউট এবং কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক কিশলয় দে-র নেতৃত্বে পরিচালিত এই গবেষণা নক্ষত্রের সেই 'শান্ত' মৃত্যু নিয়ে নতুন আলোকপাত করেছে, যা এতদিন কেবল তাত্ত্বিক আলোচনার বিষয় ছিল। গবেষণায় দেখা গেছে যে, আদি নক্ষত্রটি ছিল একটি সুপারজায়ান্ট বা অতিদানব নক্ষত্র যার প্রাথমিক ভর ছিল সূর্যের ভরের প্রায় ১৩ গুণ। তবে মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে পৌঁছানোর আগে শক্তিশালী নাক্ষত্রিক বায়ুর প্রভাবে এর উপরিভাগের অনেকটা অংশ হারিয়ে যায় এবং এর ভর কমে সূর্যের ভরের প্রায় ৫ গুণ হয়ে দাঁড়ায়। বিজ্ঞানীরা নাসা-র নিওয়াইজ (NEOWISE) মিশন, হাবল স্পেস টেলিস্কোপ এবং পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের স্থলভিত্তিক মানমন্দিরের আর্কাইভ করা তথ্য এই গবেষণায় ব্যবহার করেছেন। পর্যবেক্ষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল ২০১৪ সালের দিকে এর ইনফ্রারেড বা অবলোহিত বিকিরণের সাময়িক বৃদ্ধি, যার ঠিক পরেই নক্ষত্রটি দ্রুত ম্লান হতে শুরু করে। ২০২২ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে এর দৃশ্যমান উজ্জ্বলতা আদি অবস্থার ১০ হাজার ভাগের এক ভাগে নেমে আসে, যা নক্ষত্রটির অন্তর্ধান নিশ্চিত করে।
বিজ্ঞানীদের মূল সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, নক্ষত্রের কেন্দ্র বা কোর সম্পূর্ণভাবে ধসে পড়ে একটি কৃষ্ণগহ্বর তৈরি করেছে, যাকে জ্যোতির্বিজ্ঞানের ভাষায় 'ব্যর্থ সুপারনোভা' (failed supernova) বলা হয়। এই যুগান্তকারী আবিষ্কারটি মহাকাশে কেন সবচেয়ে বড় ভরের নক্ষত্রগুলোর সুপারনোভা বিস্ফোরণ আশানুরূপভাবে দেখা যায় না, তার একটি যৌক্তিক ব্যাখ্যা প্রদান করে। গবেষণায় আরও উঠে এসেছে যে, নক্ষত্রের বাইরের কিছু অংশ পরিচলন প্রক্রিয়ায় ছিটকে বেরিয়ে গিয়েছিল যা পরবর্তীতে শীতল হয়ে ধূলিকণায় পরিণত হয়। এই ধূলিকণাই দীর্ঘস্থায়ী অবলোহিত বিকিরণের জন্য দায়ী ছিল। এটি একটি বড় ধরনের অভিজ্ঞতামূলক সাফল্য, যা নক্ষত্রের বিবর্তনের শেষ পর্যায় সম্পর্কে আমাদের বৈজ্ঞানিক ধারণাকে কম্পিউটার সিমুলেশন থেকে সরাসরি পর্যবেক্ষণের বাস্তবতায় নিয়ে এসেছে।
এই বিস্ময়কর আবিষ্কারের সমান্তরালে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা পৃথিবী থেকে ৭৩০ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত 'RXJ0528+2838' নামক একটি শ্বেত বামন (white dwarf) নক্ষত্রকে ঘিরে এক নতুন রহস্যের উন্মোচন করেছেন। ইউরোপীয় সাউদার্ন অবজারভেটরি (ESO)-র ভেরি লার্জ টেলিস্কোপে (VLT) স্থাপিত অত্যাধুনিক মিউজ (MUSE) যন্ত্র ব্যবহার করে বিজ্ঞানীরা এই নক্ষত্রটির চারপাশে একটি বিশাল এবং চিত্তাকর্ষক শকওয়েভ বা অভিঘাত তরঙ্গ দেখতে পেয়েছেন। ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসে 'নেচার অ্যাস্ট্রোনমি' (Nature Astronomy) জার্নালে এই সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এই ঘটনাটি এতটাই অদ্ভুত যে, বর্তমানের কোনো জ্যোতির্পদার্থবৈজ্ঞানিক মডেল দিয়েই এর সঠিক ব্যাখ্যা পাওয়া যাচ্ছে না।
এই শ্বেত বামন নক্ষত্রটি সূর্যের মতো একটি সাধারণ নক্ষত্রের সাথে একটি অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ দ্বৈত বা বাইনারি সিস্টেমে অবস্থান করছে। সাধারণত এই ধরনের ব্যবস্থায় একটি অ্যাক্রিশন ডিস্ক বা পরিবৃদ্ধি চাকতি থাকার কথা, যা নক্ষত্র থেকে নির্গত পদার্থের প্রবাহকে নিয়ন্ত্রণ করে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই সিস্টেমে কোনো চাকতির অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। নক্ষত্রটির চারপাশে থাকা 'বো শকওয়েভ' (bow shockwave) নির্দেশ করে যে, শ্বেত বামনটি অন্তত ১০০০ বছর ধরে অনবরত পদার্থ নির্গত করছে যা চারপাশের আন্তঃনাক্ষত্রিক গ্যাসের সাথে প্রচণ্ড বেগে সংঘর্ষ ঘটাচ্ছে। যদিও ধারণা করা হয় যে একটি শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্র চাকতি ছাড়াই পদার্থগুলোকে নক্ষত্রের পৃষ্ঠে নিয়ে যেতে পারে, তবে এক্ষেত্রে নির্গত শক্তির পরিমাণ পরিমাপকৃত চৌম্বক ক্ষেত্রের তীব্রতাকে ছাড়িয়ে গেছে। এটি কোনো অজানা ভৌত শক্তির উপস্থিতির দিকে ইঙ্গিত করে। এই সামগ্রিক আবিষ্কারগুলো নক্ষত্রের মৃত্যুর একটি নতুন দৃশ্যপট নিশ্চিত করার পাশাপাশি ডিস্কবিহীন দ্বৈত ব্যবস্থার মিথস্ক্রিয়া সম্পর্কে প্রচলিত বৈজ্ঞানিক মডেলগুলো পুনর্মূল্যায়নের পথ প্রশস্ত করেছে।