আন্তর্জাতিক Event Horizon Telescope প্রকল্পটি এই বছর মার্চ ও এপ্রিল মাসে ব্ল্যাক হোলের প্রথম ভিডিও ছবিটি পাওয়ার পরিকল্পনা করছে।
আন্তর্জাতিক ইভেন্ট হরাইজন টেলিস্কোপ (EHT) কোলাবরেশন ২০২৬ সালের মার্চ এবং এপ্রিল মাসের জন্য একটি অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী এবং যুগান্তকারী পর্যবেক্ষণ অভিযানের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। এই মিশনের প্রধান উদ্দেশ্য হলো মেসিয়ার ৮৭ গ্যালাক্সির কেন্দ্রে অবস্থিত অতিবিশাল ব্ল্যাক হোল M87*-এর ইতিহাসের প্রথম ভিডিও চিত্র বা চলমান দৃশ্য ধারণ করা। বিজ্ঞানীরা এই মহাজাগতিক দানবের ইভেন্ট হরাইজন বা ঘটনা দিগন্তের চারপাশে ঘূর্ণায়মান উত্তপ্ত গ্যাস ও ধূলিকণার অ্যাক্রিশন ডিস্কের গতিশীলতা সরাসরি ক্যামেরাবন্দি করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন।
M87* ব্ল্যাক হোলটির বিশালতা কল্পনা করাও কঠিন; এর ভর আমাদের সূর্যের ভরের তুলনায় প্রায় ছয় বিলিয়ন গুণ বেশি এবং এর ভৌগোলিক বিস্তার আমাদের সম্পূর্ণ সৌরজগতের আকারের সাথে তুলনা করা যেতে পারে। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের নবনিযুক্ত প্লুমিয়ান জ্যোতির্বিজ্ঞানের অধ্যাপক এবং EHT কনসোর্টিয়ামের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য অধ্যাপক সেরা মার্কফ (Sera Markoff) এই অভিযানের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন যে, এই ভিডিও ক্যাম্পেইনটি মহাকাশ বিজ্ঞানের এই বিশেষ ক্ষেত্রে গবেষণার গতিকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে। গবেষকরা এই অভিযানের মাধ্যমে ব্ল্যাক হোলের ঘূর্ণন গতি এবং এর চারপাশ থেকে নির্গত অত্যন্ত শক্তিশালী রিলেটিভিস্টিক জেটের উৎস ও মেকানিজম সম্পর্কে অভূতপূর্ব তথ্য পাওয়ার প্রত্যাশা করছেন।
২০১৯ সালে M87* ব্ল্যাক হোলের ছায়ার প্রথম ঐতিহাসিক স্থির চিত্র প্রকাশের পর এটি EHT প্রকল্পের জন্য পরবর্তী সবচেয়ে বড় মাইলফলক হতে যাচ্ছে। বর্তমানে ইএইচটি একটি শক্তিশালী বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক হিসেবে কাজ করছে, যা ১২টি অত্যাধুনিক রেডিও টেলিস্কোপের সমন্বয়ে গঠিত। এই নেটওয়ার্কটি অ্যান্টার্কটিকা থেকে শুরু করে স্পেন এবং দক্ষিণ কোরিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত ভৌগোলিক এলাকায় ছড়িয়ে আছে। ২০১৯ সালের পর থেকে এই অ্যারেতে নতুন নতুন টেলিস্কোপ ও প্রযুক্তি যুক্ত হওয়ার ফলে এখন প্রতি তিন দিন অন্তর M87*-এর উচ্চমানের ছবি তোলা সম্ভব হচ্ছে। যেহেতু M87*-এর বিবর্তন বা ঘূর্ণন গতি তুলনামূলকভাবে ধীর, তাই এই নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধানে এর পরিবর্তনগুলো নিখুঁতভাবে ট্র্যাক করা সম্ভব হবে।
ব্ল্যাক হোলের অ্যাক্রিশন ডিস্কের গতিশীলতা এবং জেটের গঠন প্রক্রিয়া সফলভাবে ভিডিওতে ধারণ করা সম্ভব হলে তা বর্তমান পদার্থবিজ্ঞানের অনেক অমীমাংসিত প্রশ্নের উত্তর দেবে। এটি ব্ল্যাক হোল ফিজিক্সের বিদ্যমান তাত্ত্বিক মডেলগুলোকে আরও শক্তিশালী ও নির্ভুল করতে গুরুত্বপূর্ণ এম্পিরিক্যাল প্রমাণ সরবরাহ করবে। উজ্জ্বল অঞ্চলগুলোর কৌণিক বা আযিমুথাল গতিবিধি পরিমাপ করার মাধ্যমে ব্ল্যাক হোলের স্পিন এবং ম্যাগনেটোহাইড্রোডাইনামিক প্রক্রিয়াগুলো সম্পর্কে সরাসরি ধারণা পাওয়া যাবে। এই প্রক্রিয়াগুলোই মূলত সেই শক্তিশালী জেট তৈরির জন্য দায়ী, যা ইভেন্ট হরাইজন স্কেলের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র পদার্থবিজ্ঞানের সাথে বিশাল গ্যালাক্সির বিবর্তনীয় প্রক্রিয়ার সংযোগ স্থাপন করে।
এই প্রকল্পের লজিস্টিক বা ব্যবস্থাপনাগত চ্যালেঞ্জগুলো অত্যন্ত বিশাল, যা এই গবেষণার আন্তর্জাতিক গুরুত্বকে আরও স্পষ্ট করে তোলে। টেলিস্কোপগুলো থেকে যে বিপুল পরিমাণ ডেটা বা তথ্য উৎপন্ন হয়, তা সাধারণ ইন্টারনেটের মাধ্যমে স্থানান্তর করা প্রায় অসম্ভব। এর পরিবর্তে, দক্ষিণ মেরুর মতো অত্যন্ত দুর্গম এবং প্রতিকূল পরিবেশ থেকে হার্ড ড্রাইভগুলো শারীরিকভাবে বিমানে করে জার্মানি এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডেটা প্রসেসিং সেন্টারে পাঠাতে হয়। দক্ষিণ মেরু থেকে সংগৃহীত তথ্যগুলো প্রায়ই শীতকালীন প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে গ্রীষ্মকাল পর্যন্ত সেখানে জমা রাখা হয়, যা চূড়ান্ত ফলাফল পেতে দেরি করিয়ে দেয়। উদাহরণস্বরূপ, ২০১৭ সালে M87* থেকে সংগৃহীত ৩.৫ পেটাবাইট তথ্য প্রক্রিয়াকরণ করে প্রথম ছবি তৈরি করতে বিজ্ঞানীদের প্রায় দুই বছর কঠোর পরিশ্রম করতে হয়েছিল।
যদিও M87* ব্ল্যাক হোলটি এর ধীর বিবর্তনের কারণে ভিডিও ধারণের জন্য প্রাথমিক লক্ষ্যবস্তু হিসেবে নির্বাচিত হয়েছে, তবে ইএইচটি-র সাম্প্রতিক প্রচেষ্টাগুলো আমাদের নিজস্ব মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির কেন্দ্রে অবস্থিত ব্ল্যাক হোল স্যাজিটেরিয়াস এ* (Sgr A*)-এর দিকেও নিবদ্ধ ছিল। তবে Sgr A* এত দ্রুত পরিবর্তিত হয় যে, বর্তমান টেলিস্কোপ অ্যারে ব্যবহার করে এর একটি দীর্ঘস্থায়ী ভিডিও বা মুভি তৈরি করা অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। ২০২৬ সালের এই আসন্ন অভিযানটি মূলত স্থির জ্যোতির্বিজ্ঞান থেকে গতিশীল জ্যোতির্বিজ্ঞানের এক নতুন যুগে প্রবেশের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এই ধরনের গবেষণা মহাবিশ্বের চরম এবং রহস্যময় জ্যোতির্পদার্থবৈজ্ঞানিক ঘটনাগুলো বুঝতে এবং মহাজাগতিক ইকোসিস্টেমে তাদের ভূমিকা ব্যাখ্যা করতে অপরিহার্য ভূমিকা পালন করবে।