মহাকাশের এক বিরল এবং প্রলয়ঙ্করী ঘটনার প্রমাণ খুঁজে পেয়েছেন ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের (UW) জ্যোতির্বিজ্ঞানের ডক্টরাল গবেষক অ্যানাস্টাসিওস (অ্যান্ডি) সানিডাকিস। ২০২০ সালের আর্কাইভ করা টেলিস্কোপিক তথ্য অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে বিশ্লেষণ করতে গিয়ে তিনি এই চাঞ্চল্যকর মহাজাগতিক বিপর্যয়ের চিত্রটি আবিষ্কার করেন। তার এই গবেষণার মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল পৃথিবী থেকে প্রায় ১১,০০০ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত 'Gaia20ehk' নামক একটি নক্ষত্র, যা মূলত পপিস (Puppis) নক্ষত্রমণ্ডলীর গভীর আকাশে অবস্থান করছে।
Gaia20ehk নক্ষত্রটি একটি স্থিতিশীল মেইন-সিকোয়েন্স নক্ষত্র হিসেবে পরিচিত, যার ভৌত বৈশিষ্ট্যগুলো আমাদের অতি পরিচিত সূর্যের সাথে আশ্চর্যজনকভাবে মিলে যায়। সাধারণত এই ধরনের নক্ষত্রগুলো থেকে একটি নির্দিষ্ট মাত্রার আলো বা উজ্জ্বলতা নির্গত হওয়ার কথা থাকলেও, ২০১৬ সাল থেকে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা এর উজ্জ্বলতায় তিনটি সুস্পষ্ট ঘাটতি বা 'ডিপ' লক্ষ্য করেন। ২০২১ সালের মধ্যে এই নক্ষত্রের আলো নির্গমনের ধরণ সম্পূর্ণ অনিয়মিত এবং বিশৃঙ্খল হয়ে পড়ে, যা সূর্যসদৃশ নক্ষত্রের স্বাভাবিক আচরণের পরিপন্থী। বিজ্ঞানীরা এই অস্বাভাবিকতার কারণ হিসেবে নক্ষত্রটিকে ঘিরে আবর্তিত বিশাল পরিমাণ পাথর এবং ধূলিকণার মেঘকে দায়ী করেছেন, যা পর্যায়ক্রমে পৃথিবী পর্যন্ত পৌঁছানো আলোতে বাধা সৃষ্টি করছে।
এই বিশাল ধ্বংসাবশেষের মেঘের উৎপত্তির কারণ হিসেবে বিজ্ঞানীরা Gaia20ehk-কে কেন্দ্র করে আবর্তিত দুটি বিশালাকার গ্রহের সরাসরি সংঘর্ষের সম্ভাবনাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। গবেষণার প্রধান লেখক এবং ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যোতির্বিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক জেমস ড্যাভেনপোর্ট একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক লক্ষণের কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি জানান, যখনই দৃশ্যমান আলো কমে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই ইনফ্রারেড বা অবলোহিত বিকিরণের তীব্রতা হঠাৎ করে বহুগুণ বেড়ে গিয়েছিল। এই বিশেষ তাপীয় প্রোফাইলটি একটি অত্যন্ত শক্তিশালী গ্রহীয় সংঘর্ষের অকাট্য প্রমাণ দেয়, যা সাধারণ কোনো সংঘর্ষের চেয়ে অনেক বেশি তাপ ও শক্তি উৎপন্ন করে। ১১ মার্চ, ২০২৬ তারিখে 'দ্য অ্যাস্ট্রোফিজিক্যাল জার্নাল লেটার্স'-এ প্রকাশিত এই গবেষণাটি নিশ্চিত করে যে, এই মহাজাগতিক ঘটনাটি প্রায় সাড়ে চারশ কোটি বছর আগে পৃথিবী ও চাঁদের সিস্টেম তৈরির সময়কার সেই তাত্ত্বিক সংঘর্ষের সাথে হুবহু মিলে যায়।
Gaia20ehk সিস্টেমে তৈরি হওয়া এই ধ্বংসাবশেষের মেঘটি নক্ষত্র থেকে ঠিক ১ অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল ইউনিট (AU) দূরত্বে অবস্থান করছে, যা আমাদের পৃথিবী থেকে সূর্যের দূরত্বের সমান। এই ভৌগোলিক অবস্থানটি গবেষকদের জন্য রিয়েল-টাইমে গ্রহ গঠনের জটিল প্রক্রিয়াগুলো পর্যবেক্ষণের এক অনন্য এবং বিরল সুযোগ করে দিয়েছে। জ্যোতির্জীববিজ্ঞানের (astrobiology) মৌলিক গবেষণার ক্ষেত্রে এর গুরুত্ব অপরিসীম, কারণ পৃথিবীতে জীবনের অনুকূল পরিবেশ ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে চাঁদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইনফ্রারেড বিশ্লেষণের এই নতুন পদ্ধতিটি এখন বিজ্ঞানীদের জন্য অন্যান্য সাধারণ মহাজাগতিক অন্ধকারাচ্ছন্ন ঘটনা থেকে বড় ধরনের গ্রহীয় সংঘর্ষকে নিখুঁতভাবে আলাদা করার একটি নির্ভরযোগ্য মাধ্যম হিসেবে কাজ করবে।
অধ্যাপক ড্যাভেনপোর্ট আশা প্রকাশ করেছেন যে, ২০২৫ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যক্রম শুরু করা 'ভেরা সি. রুবিন অবজারভেটরি'র অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় আগামী এক দশকে বিজ্ঞানীরা মহাকাশে প্রায় ১০০টি নতুন গ্রহীয় সংঘর্ষের সম্ভাব্য ক্ষেত্র খুঁজে পেতে পারেন। এটি মহাবিশ্বে পৃথিবীর মতো গ্রহ গঠনের সাধারণ চিত্র এবং এর ব্যাপকতা সম্পর্কে আমাদের বর্তমান জ্ঞানকে আরও অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যাবে। বর্তমানে Gaia20ehk সিস্টেমের সেই উত্তপ্ত ধ্বংসাবশেষগুলো ধীরে ধীরে শীতল হতে শুরু করেছে। তবে এই ধ্বংসাবশেষের মেঘ থেকে ভবিষ্যতে নতুন কোনো গ্রহ, গ্রহীয় বলয় নাকি একটি বিশাল উপগ্রহ সিস্টেম তৈরি হবে, তা নিশ্চিতভাবে জানতে বিজ্ঞানীদের আরও কয়েক দশক বা এমনকি কয়েক শতাব্দী পর্যন্ত নিবিড় পর্যবেক্ষণ চালিয়ে যেতে হতে পারে।


