মহাবিশ্বের পরম সূচনা হিসেবে ‘বিগ ব্যাং’ বা মহাবিস্ফোরণ সম্ভবত ঘটেনি। তাত্ত্বিকদের প্রস্তাবিত একটি নতুন মডেল সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছে: যেখানে মহাবিশ্ব প্রথমে সংকুচিত হয়, এরপর একটি প্রতিক্ষেপণ বা ‘বাউন্স’ ঘটে এবং মুদ্রাস্ফীতি বা ‘ইনফ্লেশন’ পর্যায়ে প্রবেশ করে। এই প্রক্রিয়ায় স্থানের বক্রতা বজায় থাকে এবং এটি কোনো ধরনের বিচ্ছিন্নতা বা সিঙ্গুলারিটি ছাড়াই ভূগাণিতিকভাবে পূর্ণাঙ্গ অবস্থায় থাকে।
গবেষকরা একটি তাত্ত্বিক কাঠামো তৈরি করেছেন যেখানে স্থান-কাল নিরবচ্ছিন্নভাবে প্রবাহিত হয়। আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে, সংকোচন পর্যায়ের পর একটি প্রতিক্ষেপণ ঘটে, যা প্রচলিত বিগ ব্যাং-এর স্থলাভিষিক্ত হয়। এরপরই শুরু হয় মুদ্রাস্ফীতি—সেই অতি দ্রুত প্রসারণ যা প্রাথমিক অসামঞ্জস্যগুলোকে দূর করে গ্যালাক্সি তৈরির ভিত্তি স্থাপন করেছিল। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই মডেল স্থানকে পুরোপুরি সমতল হতে বাধ্য করে না, বরং এর স্বাভাবিক বক্রতা বজায় রাখার সুযোগ দেয়।
এটি অনেকটা ট্রাম্পোলিনের মতো, যা অতল গহ্বরে পড়ে যাওয়ার পরিবর্তে মহাবিশ্বকে নতুন শক্তিতে উপরের দিকে ছুড়ে দেয়। এখানে সমীকরণগুলো থেকেই স্বাভাবিকভাবে প্রতিক্ষেপণ বা বাউন্স তৈরি হয় এবং ভূগাণিতিক পূর্ণতা নিশ্চিত করে যে, কণা বা আলোক রশ্মির যেকোনো গতিপথ কোনো গাণিতিক বিচ্ছিন্নতা ছাড়াই উভয় দিকে অনুসরণ করা সম্ভব। গবেষণাটি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, এই ধরনের গঠন কাঠামো আধুনিক সৃষ্টিতত্ত্ব বা কসমোলজির অনেক সমস্যা এড়িয়ে যেতে সক্ষম।
তথ্য অনুযায়ী, এই মডেলটি প্রাথমিক অবস্থার জটিলতা সমাধান করে: মহাবিশ্বের সমজাতীয়তা ও আইসোট্রপি পূর্ববর্তী সংকোচন পর্যায় থেকেই উদ্ভূত হয় এবং এতে আলাদা কোনো সূক্ষ্ম বিন্যাসের প্রয়োজন পড়ে না। বক্রতাকে আমলে নেওয়ার কারণে এটি মহাজাগতিক পটভূমি বিকিরণ বা রিলিক রেডিয়েশনের ভবিষ্যৎ পর্যবেক্ষণের আরও কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি কোয়ান্টাম মহাকর্ষসহ আরও গভীর তত্ত্বগুলোর সাথে মুদ্রাস্ফীতিকে সংযুক্ত করার নতুন পথ উন্মোচন করেছে।
এই দৃষ্টিভঙ্গি মহাকাশ সম্পর্কে আমাদের ধারণাকে আমূল বদলে দেয়। আমরা ‘সময়ের সূচনা’র পরিবর্তে একটি নিরবচ্ছিন্ন ইতিহাসের কথা ভাবতে শুরু করি, যেখানে আমাদের ক্রমবর্ধমান মহাবিশ্বের একটি ‘অতীত’ থাকতে পারে। এটি কেবল কোনো গাণিতিক কৌশল নয়—বরং এমন একটি চিত্রের দিকে এক ধাপ অগ্রগতি যেখানে সিঙ্গুলারিটি বা পরম বিন্দুর বিলুপ্তি ঘটে এবং পদার্থবিজ্ঞান সব ক্ষেত্রে অখণ্ড থাকে।
সম্ভবত, এই ধরনের মডেলগুলো কেবল তাদের সম্ভাবনা উন্মোচন করতে শুরু করেছে, তবে এখনই এগুলো সৃষ্টিতত্ত্বে এক নতুন সুর বেঁধে দিচ্ছে।
এই ধরনের প্রতিটি আবিষ্কার আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, তাত্ত্বিক চিন্তার সাহসিকতা আমাদের মহাবিশ্বে মানুষের অবস্থান সম্পর্কে প্রকৃত উপলব্ধির আরও কাছাকাছি নিয়ে যাচ্ছে।


