আর্জেন্টিনার প্যাটাগোনিয়ার লা-ফ্লেচা অঞ্চলে একটি যুগান্তকারী প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কারের কথা ঘোষণা করেছেন একদল আন্তর্জাতিক গবেষক। সেখানে ১০১ মিলিয়ন বছর আগের অর্থাৎ প্রাথমিক ক্রিটেসিয়াস যুগের একটি অতি ক্ষুদ্র জীবাশ্ম ফুল 'প্যাটাগোফ্লোরা মিনিমা' (Patagoflora minima) শনাক্ত করা হয়েছে। মাত্র ৬ থেকে ৯ মিলিমিটার ব্যাসের এই ক্ষুদ্রাকৃতির পুষ্পমঞ্জরিটি এমন এক স্থানে পাওয়া গেছে যেখানে বিশালাকার ডাইনোসর 'প্যাটাগোটিটান মেয়োরাম' (Patagotitan mayorum)-এর দেহাবশেষ সংরক্ষিত ছিল। 'ক্রিটেসিয়াস রিসার্চ' (Cretaceous Research) নামক বিজ্ঞান সাময়িকীতে প্রকাশিত এই গবেষণাটি মূলত প্যালিওন্টোলজিক্যাল মিউজিয়াম এগিডিও ফেরুগ্লিও (MEF) এবং CONICET-এর বিশেষজ্ঞদের নিরলস প্রচেষ্টার ফসল, যাতে কর্নেল ইউনিভার্সিটি এবং তেরুয়েল-ডিনোপোলিস প্যালিওন্টোলজিক্যাল ফাউন্ডেশনও সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছে।
এই আবিষ্কারটি অত্যন্ত বিরল বলে বিবেচিত হচ্ছে, কারণ ফুলের মতো ভঙ্গুর কাঠামোর জীবাশ্ম সাধারণত বিশালাকার কঙ্কালের পাশে এত নিখুঁতভাবে সংরক্ষিত থাকে না। প্যাটাগোফ্লোরা মিনিমা হলো দক্ষিণ আমেরিকার দক্ষিণাঞ্চল এবং প্রাচীন সুপারকন্টিনেন্ট 'গন্ডোয়ানা' ভূখণ্ডের সপুষ্পক উদ্ভিদের (অ্যাঞ্জিওস্পার্ম) অন্যতম প্রাচীন এবং সবচেয়ে নির্ভুলভাবে সময়কাল নির্ধারণ করা নমুনা। 'প্যাটাগোনিয়া' এবং 'ফ্লোরা' (ফুল) শব্দের সমন্বয়ে নামকরণ করা এই ক্ষুদ্র উদ্ভিদটি দক্ষিণ গোলার্ধে সপুষ্পক উদ্ভিদের প্রাথমিক বৈচিত্র্য সম্পর্কে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রদান করে। মজার ব্যাপার হলো, ২০১৪ সালে প্যাটাগোটিটান মেয়োরামের ১৫০টিরও বেশি হাড় উত্তোলনের সময় আকস্মিকভাবেই এই ক্ষুদ্র ফুলটি বিজ্ঞানীদের নজরে আসে।
স্পেনের তেরুয়েলে পাওয়া সমসাময়িক সপুষ্পক উদ্ভিদের জীবাশ্মগুলো ইঙ্গিত দেয় যে, ক্রিটেসিয়াস যুগের শুরুর দিকেই এই ধরনের উদ্ভিদ বিভিন্ন মহাদেশে ছড়িয়ে পড়েছিল। প্যাটাগোফ্লোরা মিনিমার ওপর পরিচালিত এই গবেষণাটি প্যাটাগোটিটান মেয়োরামের মতো দানবীয় প্রাণীদের খাদ্যাভ্যাস এবং তৎকালীন পরিবেশ পুনর্গঠনে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। তৃণভোজী এই ডাইনোসরগুলো তাদের উষ্ণ ও আর্দ্র পরিবেশে প্রচুর পরিমাণে পাওয়া কনিফার, ফার্ন এবং সাইকাস জাতীয় উদ্ভিদ খেয়ে জীবনধারণ করত। উল্লেখ্য যে, প্রায় ১১৩ থেকে ১০০.৫ মিলিয়ন বছর আগে পৃথিবীতে বিচরণ করা প্যাটাগোটিটান মেয়োরাম ছিল বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম ডাইনোসর, যার দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ৩১ মিটার এবং ওজন ছিল ৫০ থেকে ৫৭ মেট্রিক টন।
চুবুট প্রদেশের সেরো বারসিনো ফর্মেশনের আপ্টিয়ান স্তরে (১০১ মিলিয়ন বছর আগে) প্যাটাগোফ্লোরা মিনিমার এই উপস্থিতি দক্ষিণ আমেরিকার দক্ষিণাঞ্চলে সেই সময়ের প্রথম পুষ্পমঞ্জরি আবিষ্কারের নজির স্থাপন করেছে। বিশালাকার ডাইনোসর এবং ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ফুলের এই সহাবস্থান ১০০ মিলিয়ন বছর আগের পৃথিবীর এক অনন্য চিত্র তুলে ধরে। এটি নিশ্চিত করে যে, সেই সময়ে প্যাটাগোনিয়ার ল্যান্ডস্কেপে কনিফার এবং ফার্নের আধিপত্য থাকলেও সপুষ্পক উদ্ভিদগুলো ইতিমধ্যে নিজেদের বৈচিত্র্য তৈরি করতে শুরু করেছিল। ইগনাসিও এসকাপা এবং মারিয়া এ. গান্ডোলফোর মতো বিজ্ঞানীরা জোর দিয়ে বলেছেন যে, পৃথিবীর ইতিহাসের বৃহত্তম স্থলচর প্রাণীদের বিচরণস্থলের বাস্তুসংস্থান বোঝার জন্য এই আবিষ্কারটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যান্য অঞ্চলের জীবাশ্ম পরাগরেণুর তুলনামূলক বিশ্লেষণ থেকে জানা যায় যে, সপুষ্পক উদ্ভিদের একটি প্রধান উপগোষ্ঠী, যারা ট্রিকোলপেট পরাগরেণু উৎপাদন করে, তাদের উদ্ভব হয়েছিল আফ্রিকা-দক্ষিণ আমেরিকা অঞ্চলে। যদিও উত্তর গোলার্ধে প্রাথমিক যুগের ফুলের অনেক প্রমাণ পাওয়া যায়, তবে প্যাটাগোফ্লোরা মিনিমার মতো আবিষ্কারগুলো দক্ষিণ গোলার্ধে উদ্ভিদের বিবর্তনীয় ইতিহাসকে আরও শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড় করায়। সামগ্রিকভাবে, প্যাটাগোনিয়া অঞ্চলটি প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কারের জন্য একটি প্রধান কেন্দ্র হিসেবে রয়ে গেছে, যেখানে প্যাটাগোটিটান মেয়োরামের মতো ডাইনোসরের হাড়গুলো বিশালাকার সরোপডদের বিস্ময়কর অভিযোজন ক্ষমতার সাক্ষ্য বহন করে।



