অস্ট্রেলিয়ার ইউক্যালিপটাস ফ্লোরা নিয়ে অধ্যাপক হপারের গবেষণাপত্র ২০২৫ সালের শেষে প্রকাশিত
সম্পাদনা করেছেন: An goldy
উদ্ভিদবিদ্যার জগতে বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত এক অনন্য নাম অধ্যাপক স্টিফেন ডি. হপার। দীর্ঘ পঞ্চাশ বছরের নিরলস গবেষণার পর তিনি অস্ট্রেলিয়ার ইউক্যালিপটাস ফ্লোরার ওপর তার বিশেষ গবেষণাপত্রটি সম্পন্ন করেছেন। ২০২৫ সালের শেষভাগে প্রকাশিত ২৪৮ পৃষ্ঠার এই সুবিশাল গ্রন্থটি মূলত এই বিশেষ বৃক্ষরাজির বিবর্তনীয় ইতিহাস, জীববিজ্ঞান এবং তাদের বর্তমান সংকটাপন্ন সংরক্ষণ অবস্থার ওপর বিস্তারিত আলোকপাত করে। হপারের এই কাজটিকে তার দীর্ঘ কর্মজীবনের এক অনন্য মাইলফলক এবং বৈজ্ঞানিক উৎকর্ষের প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
অধ্যাপক হপার বর্তমানে ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে জীববৈচিত্র্য বিষয়ের অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত আছেন। এর আগে ২০০৬ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত তিনি লন্ডনের বিখ্যাত রয়্যাল বোটানিক গার্ডেনস কিউ-এর পরিচালক হিসেবে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন। তার এই নতুন গবেষণায় আধুনিক বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির সাথে আদিবাসীদের ঐতিহ্যগত পরিবেশগত জ্ঞানের এক অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছে। বিশেষ করে দক্ষিণ-পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার নুঙ্গার (Noongar) সম্প্রদায়ের প্রবীণদের সাথে নিবিড় সহযোগিতার মাধ্যমে তিনি পশ্চিমা বিজ্ঞান ও প্রাচীন লোকজ জ্ঞানকে একই সুতোয় গেঁথেছেন। উল্লেখ্য যে, ইউক্যালিপটাস, করিন্বিয়া (Corymbia) এবং অ্যাঙ্গোফোরা (Angophora) গণভুক্ত প্রায় ৯০০টি প্রজাতি অস্ট্রেলিয়ার ভূপ্রকৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে টিকে আছে।
এই গবেষণাপত্রটি কেবল বিজ্ঞানের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়; এটি বিবর্তন, শ্রেণিবিন্যাস এবং সংরক্ষণের পাশাপাশি দক্ষিণ-পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার নুঙ্গার সৃষ্টিতত্ত্ব বা কসমোলজিতে ইউক্যালিপটাসের গুরুত্ব নিয়ে একটি বিশেষ অধ্যায় উপস্থাপন করে। নুঙ্গার প্রবীণরা তাদের ভূমি (Boodja) এবং ছয়টি ঋতু—বিরাক, বুনুরু, জেরান, মাকুরু, জিলবা এবং কাম্বারাং—সম্পর্কিত তাদের গভীর ও প্রাচীন জ্ঞান এই গবেষণায় যুক্ত করেছেন। এই প্রাচীন জ্ঞান কেবল তাত্ত্বিক নয়, বরং গাছের প্রজাতি শনাক্তকরণ এবং ফল সংগ্রহের সঠিক সময় নির্ধারণের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহারিক ক্ষেত্রেও এটি পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করে।
পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় ইউক্যালিপটাস গাছের ভূমিকা অপরিসীম এবং বিস্ময়কর। বিশ্বের সবচেয়ে লম্বা সপুষ্পক উদ্ভিদ হিসেবে পরিচিত মাউন্টেন অ্যাশ (Eucalyptus regnans) উচ্চতায় ১০০.৫ মিটার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। এই গাছের সুগন্ধি পাতায় থাকা এসেনশিয়াল অয়েল বা উদ্বায়ী তেল যেমন অ্যান্টিসেপটিক গুণের কারণে চিকিৎসা ও সুগন্ধি শিল্পে ব্যবহৃত হয়, তেমনি এই তেলের উপস্থিতি গাছগুলোকে অত্যন্ত দাহ্য করে তোলে, যা বনাঞ্চলে অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি বাড়ায়। সাম্প্রতিক গবেষণায় আরও একটি চমকপ্রদ তথ্য উঠে এসেছে; কিম্বার্লি অঞ্চলের মতো এলাকায় মাটির গভীরে থাকা স্বর্ণের খনি শনাক্ত করতে ইউক্যালিপটাস পাতা নির্দেশক হিসেবে কাজ করতে পারে। গাছগুলো তাদের সংবহনতন্ত্রের মাধ্যমে মাটির গভীর থেকে সোনার আয়ন পাতায় পরিবহন করে আনে, যা খনিজ অনুসন্ধানে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।
অধ্যাপক হপার, যিনি ১৯৭৭ সালে পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার উদ্ভিদ সংরক্ষণ গবেষণার প্রথম কর্মকর্তা হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেছিলেন এবং পরবর্তীতে পার্থের কিংস পার্কের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন, তিনি প্রকৃতির সাথে মানুষের টেকসই সহাবস্থানের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। দীর্ঘ পঞ্চাশ বছরের মাঠ পর্যায়ের গবেষণায় তোলা অসংখ্য দুর্লভ আলোকচিত্রে সমৃদ্ধ এই মনোগ্রাফটি আদিবাসীদের প্রজ্ঞা এবং আধুনিক বিজ্ঞানের এক সমন্বিত দলিল। এটি কেবল একটি বৈজ্ঞানিক প্রকাশনা নয়, বরং প্রকৃতির সাথে টিকে থাকার এবং পরিবেশ সংরক্ষণের এক দীর্ঘস্থায়ী ও কার্যকর পথনির্দেশিকা হিসেবে বিশ্বজুড়ে সমাদৃত হবে।
4 দৃশ্য
উৎসসমূহ
Australian Broadcasting Corporation
DAFF
Booktopia
University of Western Australia
NewSouth Books
New Books Network
এই বিষয়ে আরও খবর পড়ুন:
আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।
