পাতার বর্ণালী প্রতিফলন ও জিনগত বৈশিষ্ট্যের গভীর সম্পর্ক: বনভূমি পর্যবেক্ষণে বৈপ্লবিক পরিবর্তন
সম্পাদনা করেছেন: An goldy
নটর ডেম বিশ্ববিদ্যালয়ের (University of Notre Dame) একদল বিজ্ঞানী উদ্ভিদের পাতার বর্ণালী প্রতিফলন এবং তাদের নির্দিষ্ট জিনের অভিব্যক্তির মধ্যে একটি সরাসরি ও শক্তিশালী সম্পর্ক খুঁজে পেয়েছেন। এই যুগান্তকারী গবেষণাটি সম্প্রতি বিখ্যাত বিজ্ঞান সাময়িকী 'নেচার: কমিউনিকেশনস আর্থ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট' (Nature: Communications Earth & Environment)-এ প্রকাশিত হয়েছে। এই গবেষণার মূল সাফল্য হলো, এখন থেকে উপগ্রহের মাধ্যমে প্রাপ্ত বর্ণালী তথ্য বিশ্লেষণ করেই উদ্ভিদের আণবিক বা মলিকুলার অবস্থা সম্পর্কে নিখুঁত ধারণা পাওয়া সম্ভব। এর ফলে বনের গাছপালা কোনো ধরনের চাপে বা সংকটে থাকলে, তার বাহ্যিক লক্ষণ প্রকাশ পাওয়ার অনেক আগেই বিজ্ঞানীরা সতর্কবার্তা দিতে পারবেন, যা বন সংরক্ষণে এক নতুন মাত্রা যোগ করবে।
এই গবেষণার জন্য উত্তর উইসকনসিন (Northern Wisconsin) এবং মিশিগানের আপার পেনিনসুলার (Upper Peninsula of Michigan) গভীর বনাঞ্চল থেকে সুগার ম্যাপেল (Acer saccharum) এবং রেড ম্যাপেল (Acer rubrum) গাছের পাতার নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছিল। নটর ডেম ইউনিভার্সিটি এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চ সেন্টার (UNDERC)-এর পরিচালক এবং এই গবেষণার প্রধান সমন্বয়কারী নাথান সোয়েনসন (Nathan Swenson) এই প্রকল্পের নেতৃত্ব দেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, প্রতিফলিত আলোর নির্দিষ্ট তরঙ্গদৈর্ঘ্যের সাথে গাছের সেইসব জিনের গভীর যোগসূত্র রয়েছে যা মূলত খরা মোকাবিলা এবং ক্ষতিকারক কীটপতঙ্গের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে কাজ করে। গবেষণায় দেখা গেছে, পরীক্ষিত জিনগুলোর অর্ধেকেরও বেশি ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট বর্ণালী বৈশিষ্ট্যের সাথে স্পষ্ট মিল রয়েছে, যা প্রতিটি গাছের জন্য একটি স্বতন্ত্র আণবিক 'সিগনেচার' বা ছাপ তৈরি করে।
এই উদ্ভাবনী কার্যপদ্ধতিটি আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন (ISS)-এ স্থাপিত অত্যাধুনিক সেন্সর ব্যবহার করে বিশাল বনভূমির বাস্তুসংস্থানকে জিনোম-স্কেলে পর্যবেক্ষণ করার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। এই প্রকল্পটি মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা (NASA)-র অর্থায়নে পরিচালিত হচ্ছে। সাধারণত বিশাল বনভূমিতে প্রথাগত পদ্ধতিতে নমুনা সংগ্রহ এবং জিনোম বিশ্লেষণ করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং সময়সাপেক্ষ বিষয়। কিন্তু রিমোট সেন্সিং বা দূর অনুধাবন প্রযুক্তির মাধ্যমে এখন অনেক কম সময়ে এবং নিখুঁতভাবে গভীর তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হচ্ছে। এই গবেষণাটি মহাকাশ স্টেশনে চলমান 'জেডি' (GEDI) মিশনের মতো বিদ্যমান প্রকল্পগুলোর পরিপূরক হিসেবে কাজ করবে, যা মূলত বনভূমির বায়োমাস ম্যাপিং বা মানচিত্রায়নের কাজ করে থাকে, এবং এখন এর সাথে আণবিক স্তরের বোঝাপড়াও যুক্ত হলো।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) চালিত বৃক্ষ প্রজাতির মানচিত্রের সাথে এই নতুন বর্ণালী তথ্যগুলোর সমন্বয় ঘটানো হলে প্রতিটি গাছের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ এবং বিস্তারিত প্রোফাইল তৈরি করা সম্ভব হবে। বনভূমির স্বাস্থ্যহানির প্রাথমিক লক্ষণ শনাক্ত করার সাথে সাথে দ্রুত এবং সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণ করা এখন অনেক সহজ হবে, যা পৃথিবীর বায়োমাস এবং কার্বন ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য অত্যন্ত জরুরি। এই নতুন পদ্ধতিটি কেবল গাছের বাহ্যিক বা ভৌত বৈশিষ্ট্য নথিভুক্ত করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি খরা এবং কীটপতঙ্গের মতো প্রাকৃতিক প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে গাছের অভ্যন্তরীণ আণবিক প্রতিরোধের প্রক্রিয়াগুলো বুঝতে বিজ্ঞানীদের সাহায্য করবে। এর মাধ্যমে বনভূমি ব্যবস্থাপনায় এক আধুনিক ও বিজ্ঞানভিত্তিক যুগের সূচনা হলো যা দীর্ঘমেয়াদী পরিবেশ রক্ষায় সহায়ক হবে।
3 দৃশ্য
উৎসসমূহ
Futurity
Notre Dame News
Futurity
ResearchGate
News
ScienceDaily
এই বিষয়ে আরও খবর পড়ুন:
আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।