থোয়াইটস হিমবাহ অভিযানে আংশিক সাফল্য: তথ্য সংগ্রহ হলেও হারালো গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ সরঞ্জাম
সম্পাদনা করেছেন: Uliana S.
পশ্চিম অ্যান্টার্কটিকার থোয়াইটস হিমবাহ, যা বিশ্বজুড়ে 'ডুমসডে গ্লেসিয়ার' বা 'কেয়ামতের হিমবাহ' নামে পরিচিত, সেখানে পরিচালিত একটি আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক অভিযান বরফের মূল স্তরের নিচ থেকে প্রথমবারের মতো সরাসরি পরিমাপ সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছে। তবে এই সাফল্যের পাশাপাশি মিশনটি একটি বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে; দীর্ঘমেয়াদী পর্যবেক্ষণের জন্য স্থাপিত একটি সিস্টেম বরফের নিচে আটকা পড়ে যাওয়ায় অভিযানটি আংশিক ব্যর্থ বলে গণ্য হচ্ছে। এই অভিযানটি বিজ্ঞানীদের জন্য যেমন নতুন আশার আলো দেখিয়েছে, তেমনি অ্যান্টার্কটিকার চরম প্রতিকূল পরিবেশে কাজ করার ঝুঁকিগুলোকেও পুনরায় সামনে নিয়ে এসেছে।
গবেষকরা সেখানে অস্থায়ী পরিমাপক যন্ত্র স্থাপন করতে পেরেছিলেন, যা সমুদ্রের উত্তাল পরিস্থিতি এবং অপেক্ষাকৃত উষ্ণ পানির অনুপ্রবেশ শনাক্ত করেছে। এই উষ্ণ পানি হিমবাহের তলদেশ সক্রিয়ভাবে এবং উল্লেখযোগ্যভাবে গলিয়ে দিচ্ছে বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে। এই গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলো হিমবাহের গ্রাউন্ডিং লাইনের কাছ থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। যুক্তরাজ্যের সমান আয়তনের এই বিশালাকার হিমবাহের তলদেশে পৌঁছাতে বিজ্ঞানীরা 'হট ড্রিলিং' বা গরম পানি দিয়ে ছিদ্র করার প্রযুক্তি ব্যবহার করেন এবং প্রায় ১০০০ মিটার গভীর একটি উল্লম্ব গর্ত তৈরি করেন। এই গভীরতা থেকে প্রাপ্ত তথ্যগুলো হিমবাহের গলন প্রক্রিয়া এবং সমুদ্রের সাথে এর মিথস্ক্রিয়া বুঝতে অত্যন্ত সহায়ক হবে।
প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে বিজ্ঞানীদের দলটি দ্রুত স্থান ত্যাগ করতে বাধ্য হন, যার ফলে দুই বছর ধরে নিরবচ্ছিন্নভাবে তথ্য সংগ্রহের জন্য ডিজাইন করা একটি বিশাল 'মুরিং সিস্টেম' বা নোঙর করা পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা সেই গর্তেই ফেলে আসতে হয়। ধারণা করা হচ্ছে, হিমবাহের অতি দ্রুত গতিবেগ—যা দিনে প্রায় নয় মিটার পর্যন্ত হতে পারে—এই সরঞ্জামটি হারিয়ে যাওয়ার প্রধান কারণ। অ্যান্টার্কটিকায় এ ধরনের মাঠ পর্যায়ের কাজ সবসময়ই উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এবং খুব অল্প সময়ের মধ্যে অনেকগুলো প্রাকৃতিক উপাদানের নিখুঁত সমন্বয়ের প্রয়োজন হয়। সামান্য বিচ্যুতিতে পুরো সরঞ্জাম হারানোর সম্ভাবনা থাকে, যা এই মিশনের ক্ষেত্রেও ঘটেছে।
এই মিশনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল কারণ থোয়াইটস হিমবাহের সম্পূর্ণ পতন ঘটলে বিশ্বজুড়ে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা প্রায় ৬৫ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেতে পারে। বর্তমানে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিতে এই হিমবাহটি ৮ শতাংশ অবদান রাখছে। দীর্ঘমেয়াদী সরঞ্জাম হারানোর ক্ষতি সত্ত্বেও, প্রাথমিক যে তথ্যগুলো উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে, সেগুলোকে বিজ্ঞানীরা সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির পূর্বাভাস মডেলগুলোকে আরও নিখুঁত করার ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে দেখছেন। এই তথ্যগুলো ভবিষ্যতে উপকূলীয় অঞ্চলের সুরক্ষা পরিকল্পনায় এবং বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বড় ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এই গবেষণাটি 'ইন্টারন্যাশনাল থোয়াইটস গ্লেসিয়ার কোলাবরেশন' (ITGC)-এর অধীনে পরিচালিত হচ্ছে, যেখানে শতাধিক বিজ্ঞানী যুক্ত রয়েছেন। হারিয়ে যাওয়া পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থাটি ছিল পশ্চিম অ্যান্টার্কটিক বরফের চাদর নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং যুক্তরাজ্যের একটি যৌথ কর্মসূচির অংশ। সমুদ্রবিজ্ঞানী কিথ মাকিনসন জোর দিয়ে বলেছেন যে, হিমবাহের মূল অংশের নিচে উষ্ণ এবং দ্রুত প্রবাহিত পানির অস্তিত্বের এই প্রথম সরাসরি প্রমাণগুলো সমুদ্রের অস্থিতিশীল ভূমিকার বিষয়টি নিশ্চিত করে। এই প্রাথমিক তথ্যগুলো অত্যন্ত বৈজ্ঞানিক মূল্যের এবং ভবিষ্যতের মিশনগুলোর পরিকল্পনায় এগুলোকে ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করা হবে।
গত আট দশক ধরে থোয়াইটস হিমবাহটি ক্রমাগত পিছিয়ে যাচ্ছে এবং গত ত্রিশ বছরে এই প্রক্রিয়ার গতি নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। হিমবাহের পূর্ব দিকের আইস শেল্ফ বা বরফের তাকটি, যা এতদিন একটি প্রাকৃতিক খুঁটি হিসেবে কাজ করছিল, সেখানে বড় বড় ফাটল দেখা দিচ্ছে যা এর গঠনকে দুর্বল করে দিচ্ছে এবং আমুন্ডসেন সাগরে বরফ ধসে পড়ার গতি বাড়িয়ে দিচ্ছে। এই ভয়াবহ পরিস্থিতি মোকাবিলায় কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় এবং নিউ ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশলীরা উষ্ণ সামুদ্রিক স্রোতকে বাধা দেওয়ার জন্য প্রায় ১৫০ মিটার উঁচু এবং ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি বিশাল আন্ডারওয়াটার 'কার্টেন' বা পানির নিচে পর্দা তৈরির মতো বৈপ্লবিক ইঞ্জিনিয়ারিং সমাধানের প্রস্তাব দিয়েছেন। এই ধরনের সাহসী পদক্ষেপই হয়তো ভবিষ্যতে হিমবাহের গলন রোধে কার্যকর হতে পারে।
4 দৃশ্য
উৎসসমূহ
Daily Mail Online
Polar Journal
British Antarctic Survey
The Independent
Yourweather.co.uk
Green Matters
এই বিষয়ে আরও খবর পড়ুন:
আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।