প্রাণীজগতের ইতিবাচক আবেগ পরিমাপ: ডলফিন ও কেয়া পাখির উপর বৈজ্ঞানিক গবেষণা

সম্পাদনা করেছেন: Olga Samsonova

বৈজ্ঞানিক সমাজ প্রাণীজগতের ইতিবাচক আবেগ বা 'পজিটিভ অ্যাফেক্ট' পরিমাপের দিকে ক্রমশ মনোনিবেশ করছে, যা পূর্বে মানবসদৃশ চিন্তাভাবনা এড়িয়ে চলার প্রবণতার কারণে কিছুটা বাধাগ্রস্ত হয়েছিল। বহু-বিশ্ববিদ্যালয় সমন্বিত একটি প্রকল্প, যা অনানুষ্ঠানিকভাবে 'জয়-ও-মিটার' নামে পরিচিত, বিভিন্ন প্রজাতির মধ্যে তীব্র আনন্দের পরিমাপযোগ্য সংকেত চিহ্নিত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এই গবেষণার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট রয়েছে, যেখানে বিংশ শতাব্দীর আচরণবাদীরা পাভলভের কুকুর এবং স্কিনারের ইঁদুরের মতো কেবল বস্তুনিষ্ঠভাবে গণনাযোগ্য কার্যকলাপের ওপর গুরুত্ব দিত, ফলে অনুভূতির মতো বিষয়গুলি বৈজ্ঞানিক অধ্যয়নের বাইরে থেকে গিয়েছিল। বর্তমানে, এই গবেষণা ডলফিন, বনবো এবং টিয়াপাখির উপর পূর্ববর্তী কাজের ভিত্তিতে অগ্রসর হচ্ছে, যার উদ্দেশ্য আনন্দের বস্তুনিষ্ঠ মানদণ্ড প্রতিষ্ঠা করা।

নিউজিল্যান্ডের বুদ্ধিমান কেয়া পাখির উপর পরিচালিত গবেষণায় নির্দিষ্ট ধ্বনি এবং আচরণের সংযোগ পাওয়া গেছে যা চিনাবাদাম মাখনের মতো পুরস্কারের সঙ্গে সম্পর্কিত। এই কেয়া পাখিরা পুরস্কার হিসেবে চিনাবাদাম মাখন পেলে খেলার ছলে 'ওয়ার্বল কল' নামক এক ধরনের শব্দ করে, যা অন্য কেয়াদের মধ্যে 'ট্যাপ-ড্যান্সিং' এর মতো আচরণ সৃষ্টি করতে পারে। গবেষকরা আনন্দের মাত্রা স্ট্রেস থেকে আলাদা করতে নমুনা থেকে হরমোন বিশ্লেষণ করছেন; যেমন, কর্টিসল হরমোনের মাত্রা বৃদ্ধি পেলে তা চাপ নির্দেশ করে, যেখানে অক্সিটোসিন ইতিবাচক অবস্থার সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। ইউনিভার্সিটি অফ লেথব্রিজের ইথোলজিস্ট সার্জিও পেলিস উল্লেখ করেছেন যে, শুধুমাত্র আচরণের উপর নির্ভর না করে জৈবিক মার্কার পরিমাপ করা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বাহ্যিক আচরণ অনেক সময় ভুল ব্যাখ্যা হতে পারে বা প্রাণীটি 'ভান' করতে পারে।

ডলফিনের ক্ষেত্রে, মাছ পেলে বা প্রশিক্ষকের কাছ থেকে পুরস্কার পেলে তারা এক ধরনের 'ভিক্টরি স্কুইল' ধ্বনি তৈরি করে, যা মস্তিষ্কে ডোপামিন নামক পুরস্কার রাসায়নিকের নিঃসরণকে প্রতিফলিত করে বলে গবেষকরা মনে করেন। অন্যদিকে, বন্দী ডলফিনের সুস্থতা মূল্যায়নে এই 'জয়-ও-মিটার' অত্যন্ত মূল্যবান হতে পারে, যেমনটি ২০২০ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে যেখানে নতুন বস্তু যেমন বুদ্বুদ জেনারেটর বা কৃত্রিম টার্ফে আবৃত ব্যারেল সরবরাহ করা হয়েছিল, তবে ডলফিনগুলি এই নতুন বস্তুগুলি এড়িয়ে গিয়েছিল। কেয়া পাখির উপর গবেষণার অংশ হিসেবে, গবেষকরা তাদের চোখের চারপাশের শরীরের তাপমাত্রা পরিমাপের জন্য ইনফ্রারেড ক্যামেরা ব্যবহার করছেন, কারণ তাপমাত্রা চাপের সাথে পরিবর্তিত হয়, তাই আনন্দের সাথেও পরিবর্তিত হতে পারে। এই গবেষণায়, চিনাবাদাম মাখনকে একটি 'বিশাল প্রাপ্তি' হিসেবে গণ্য করা হয়, যা গাজরের মতো সাধারণ খাবারের চেয়ে অনেক বেশি ইতিবাচক সাড়া জাগায়।

ইতিবাচক আবেগের এই পরিমাপ কেবল প্রাণীর কল্যাণকেই উন্নত করবে না, বরং এটি সুখের বিবর্তনীয় অন্তর্দৃষ্টি উন্মোচন করতে পারে। এই ধরনের গবেষণা, যা অপটিমিজম পরীক্ষা (কগনিটিভ বায়াস টেস্ট) এবং ফিজিয়োলজিক্যাল ইন্ডিকেটরগুলির উপর নির্ভর করে, প্রাণীর আনন্দের তীব্রতা পরিমাপের জন্য একটি তুলনামূলক পদ্ধতি প্রদান করে। কেয়া পাখি, যা নিউজিল্যান্ডের দক্ষিণ দ্বীপের স্থানীয় এবং অত্যন্ত বুদ্ধিমান প্রজাতি, তাদের খেলার প্রবণতা কেবল বন্দীদশার কারণে নয়, বরং তাদের বন্য পরিবেশে টিকে থাকার জন্য অপরিহার্য। এই বৈজ্ঞানিক প্রচেষ্টা প্রাণীদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করার জন্য ব্যবহারিক প্রয়োগের সুযোগ তৈরি করছে, যা শারীরিক, সামাজিক এবং জ্ঞানীয় সমৃদ্ধির কৌশলগুলিকে অন্তর্ভুক্ত করে। ইতিবাচক আবেগের এই পরিমাপটি প্রাণী কল্যাণের মূল্যায়নে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ, যা পূর্বে নেতিবাচক অভিজ্ঞতার পরিমাপের উপর বেশি মনোযোগ দেওয়ার বিপরীতে একটি ভারসাম্য তৈরি করছে। ডলফিন এবং কেয়া পাখির মতো জটিল প্রাণীদের উপর মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করে, বিজ্ঞানীরা মানুষের সাথে তাদের পারস্পরিক উৎস এবং অভিজ্ঞতা সম্পর্কে গভীর ধারণা লাভ করার পথে অগ্রসর হচ্ছেন।

13 দৃশ্য

উৎসসমূহ

  • VICE

  • Science News

  • VICE

  • Uniavisen

  • Science News

  • John Templeton Foundation

আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।