ক্লিভার হান্স প্রভাব: প্রাণী গবেষণায় গবেষকের সূক্ষ্ম ইঙ্গিতের ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত

সম্পাদনা করেছেন: Olga Samsonova

বিংশ শতাব্দীর শুরুতে বার্লিনে 'ক্লিভার হান্স' নামক একটি ঘোড়া বিশ্বজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছিল, কারণ আপাতদৃষ্টিতে প্রাণীটির মধ্যে অসাধারণ বুদ্ধিমত্তা পরিলক্ষিত হয়েছিল। প্রশিক্ষক ভিলহেলম ফন ওস্টেন, যিনি একজন জার্মান গণিত শিক্ষক এবং অপেশাদার ঘোড়া প্রশিক্ষক ছিলেন, দাবি করেছিলেন যে এই অরলভ প্রজাতির ঘোড়াটি জটিল গাণিতিক সমস্যার সমাধান করতে সক্ষম, এমনকি জার্মান ভাষা পড়তে ও বুঝতেও পারে। প্রদর্শনী চলাকালীন, হান্স তার খুর দিয়ে টোকা মেরে উত্তর দিত; যেমন, সংখ্যা বোঝাতে একবার, দুইবার টোকা দিত এবং অক্ষর বোঝাতে বর্ণমালার ক্রম অনুসারে টোকা দিত, যেখানে একটি টোকা 'এ' এবং দুটি টোকা 'বি' নির্দেশ করত। ফন ওস্টেনের দাবি অনুযায়ী, হান্স কেবল পাটিগণিতেই পারদর্শী ছিল না, এটি ছবি দেখে চিত্রশিল্পীদের শনাক্ত করতে পারত, বিভিন্ন রঙের পার্থক্য করতে পারত এবং সঙ্গীতের সুর চিনতে পারত।

১৮৯১ সালে শুরু হওয়া এই প্রদর্শনীগুলিতে, হান্স প্রায় ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রে সঠিক উত্তর দিত, যা কিছু বিবরণ অনুযায়ী একজন গড়পড়তা চৌদ্দ বছর বয়সী মানুষের গাণিতিক দক্ষতার সমতুল্য ছিল। এই ধরনের কৃতিত্বের কারণে, বহু জীববিজ্ঞানী, মনোবিজ্ঞানী এবং সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করেছিল যে প্রাণীরা মানুষের মতো চিন্তা করতে এবং অ-মৌখিক ভাষায় ধারণা প্রকাশ করতে পারে। জনসাধারণের এবং বিদ্বান মহলের তীব্র আগ্রহের ফলস্বরূপ, ১৯০৪ সালে জার্মান শিক্ষা মন্ত্রণালয় হান্সের ক্ষমতা যাচাই করার জন্য একটি কমিশন গঠন করে। এই কমিটিতে প্রাণীবিজ্ঞানী, মনোবিজ্ঞানী, স্কুল শিক্ষক এবং একজন সার্কাস ব্যবস্থাপকও অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। দেড় মাস ধরে বিস্তৃত পরীক্ষার পরেও, কমিশন প্রাথমিকভাবে কোনো প্রকার প্রতারণার প্রমাণ খুঁজে পায়নি এবং ঘোড়ার প্রতিভাগুলিকে সত্যিকারের বলে ধরে নিয়েছিল, যদিও কিছু সমালোচক সন্দেহ পোষণ করেছিলেন।

এই রহস্যের চূড়ান্ত সমাধান আসে মনোবিজ্ঞানী অস্কার ফংস্টের নিবিড় পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে, যিনি বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইকোলজিক্যাল ইনস্টিটিউটের একজন ছাত্র ছিলেন। ফংস্ট কঠোর পরীক্ষামূলক নকশা ব্যবহার করে বাহ্যিক প্রভাবগুলি দূর করার চেষ্টা করেন, যা আচরণগত মনোবিজ্ঞানে পরীক্ষামূলক নকশার একটি ধ্রুপদী প্রাথমিক উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়। ফংস্টের সুচিন্তিত পরীক্ষাগুলির মধ্যে একটি ছিল প্রশ্নকর্তাকে দূরে সরিয়ে রাখা বা প্রশ্নকর্তা উত্তরটি না জানলে পরীক্ষা করা। তিনি লক্ষ্য করেন যে, যখন প্রশ্নকর্তা উত্তরটি জানতেন না, তখন হান্সের সঠিক উত্তর দেওয়ার হার প্রায় শূন্যে নেমে আসত। উপরন্তু, ঘোড়াটি যখন প্রশ্নকর্তার মুখের সূক্ষ্ম প্রতিক্রিয়া দেখতে পেত না, তখনও তার পারফরম্যান্স ব্যাহত হতো।

ফংস্টের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, হান্স কোনো গাণিতিক গণনা করছিল না; বরং এটি মানুষের সূক্ষ্ম, প্রায় অদৃশ্য শারীরিক ভাষার ইঙ্গিতগুলি—যেমন শ্বাস-প্রশ্বাস, অঙ্গভঙ্গি এবং মুখের অভিব্যক্তির পরিবর্তন—খুব দক্ষতার সাথে পড়ে নিচ্ছিল, যা প্রশ্নকর্তার অজান্তেই ঘটত। যখন হান্স সঠিক টোকা দিত, তখন প্রশ্নকর্তার মধ্যে যে উত্তেজনা দেখা যেত এবং সঠিক টোকার পরে সেই উত্তেজনা দূর হতো, তা ফংস্ট পর্যবেক্ষণ করেন। এই সূক্ষ্ম সংকেতগুলি পড়ার জন্য হান্সকে চিনির কিউব আকারে পুরস্কৃত করা হতো। ফংস্ট ১৯০৭ সালে তাঁর গবেষণামূলক গ্রন্থে এই ঘটনাটি নথিভুক্ত করেন, যা 'ক্লিভার হান্স প্রভাব' নামক স্থায়ী ধারণাটির জন্ম দেয়।

এই প্রভাবটি প্রাণী জ্ঞান গবেষণায় সতর্ক পরীক্ষামূলক নকশার অপরিহার্য প্রয়োজনীয়তাকে তুলে ধরে, যেখানে গবেষকের অনিচ্ছাকৃত সংকেত প্রদানের বিপদ রয়েছে, যা পরীক্ষামূলক ফলাফলকে প্রভাবিত করতে পারে। আচরণগত মনোবিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠাতা জন বি. ওয়াটসন এই কাজটিকে 'অপ্রশিক্ষিত কিন্তু উৎসাহী পর্যবেক্ষকদের জন্য একটি চিরন্তন প্রতিষেধক' হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। ফংস্টের এই আবিষ্কারের ফলে, প্রাণীর জ্ঞানীয় ক্ষমতা অধ্যয়নের ক্ষেত্রে গবেষকরা কঠোরভাবে মুখোমুখি যোগাযোগ এড়িয়ে চলার নীতি গ্রহণ করেন, যা আজও গবেষণার একটি মৌলিক শিক্ষা হিসেবে বিবেচিত। এই প্রভাবটি কেবল প্রাণীর গবেষণাতেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং মানব গবেষণাতেও গবেষকের সূক্ষ্ম ও অনৈচ্ছিক সংকেতের প্রভাবকে নির্দেশ করে, যা পক্ষপাত সৃষ্টি করতে পারে। ফংস্টের এই বিশ্লেষণ পরবর্তীতে অনেক ক্ষেত্রে, যেমন কুকুরদের বস্তু নির্বাচনের কাজে মালিকদের ইঙ্গিতের প্রভাব অধ্যয়নেও প্রাসঙ্গিকতা লাভ করেছে।

6 দৃশ্য

উৎসসমূহ

  • Stiri pe surse

  • vertexaisearch.cloud.google.com

  • Grokipedia

  • Britannica

  • Lessons from History

  • Wild Equus - Horses - WordPress.com

আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।