১৯৮৬ সালের পারমাণবিক দুর্ঘটনার পর চেরনোবিল বর্জন অঞ্চল (CEZ) দীর্ঘমেয়াদী তেজস্ক্রিয়তার প্রভাব অধ্যয়নের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক গবেষণাগার হিসেবে কাজ করছে। মানুষের প্রবেশাধিকার সীমিত থাকায়, এই অঞ্চলে ধূসর নেকড়েসহ বন্যপ্রাণীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা পরিবেশগত স্থিতিস্থাপকতার একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞানীগণ এই দূষিত বাস্তুতন্ত্রে বসবাসকারী নেকড়েদের উপর গবেষণা পরিচালনা করেছেন, যা বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞানের ক্ষেত্রে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
চেরনোবিল বর্জন অঞ্চলের নেকড়েদের ঘনত্ব পার্শ্ববর্তী সংরক্ষিত অঞ্চলের তুলনায় প্রায় সাত গুণ বেশি বলে অনুমান করা হয়, যার প্রধান কারণ শিকারের অনুপস্থিতি এবং মানুষের হস্তক্ষেপের অভাব। এই নেকড়েরা পারমাণবিক চুল্লির কেন্দ্রস্থলের কাছাকাছি উচ্চ মাত্রার তেজস্ক্রিয়তার সংস্পর্শে আসে, যা মানুষের জন্য নির্ধারিত সুরক্ষা সীমার চেয়েও অনেক বেশি। ২০১৪ সালে প্রিন্সটন দলের সদস্যরা নেকড়েদের উপর জিপিএস এবং রেডিয়েশন ডসিমিটারযুক্ত কলার স্থাপন করেন, যার মাধ্যমে তারা নেকড়েদের গতিবিধি এবং তেজস্ক্রিয়তার মাত্রা বাস্তব সময়ে পরিমাপ করতে সক্ষম হন। গবেষণায় দেখা গেছে যে, এই নেকড়েরা প্রতিদিন মানুষের জন্য আইনি সুরক্ষার সীমার ছয় গুণেরও বেশি তেজস্ক্রিয়তার সম্মুখীন হয়।
গবেষণায় আরও জানা গেছে যে, এই নেকড়েদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা পরিবর্তিত হয়েছে, যা মানবদেহে রেডিওথেরাপি গ্রহণকারী ক্যান্সার রোগীদের অনুরূপ। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হলো, বিজ্ঞানীরা নেকড়েদের জিনোমের নির্দিষ্ট কিছু অংশ শনাক্ত করেছেন যা ক্যান্সারের ঝুঁকি বৃদ্ধির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা প্রদান করে বলে মনে করা হচ্ছে। প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক শেন ক্যাম্পবেল-স্ট্যান্টন উল্লেখ করেছেন যে, চেরনোবিলের দ্রুত পরিবর্তনশীল পরিবেশে এই নেকড়েরা এক ধরনের দ্রুত প্রাকৃতিক নির্বাচন প্রক্রিয়ার সম্মুখীন হচ্ছে, যেখানে ক্যান্সার সহনশীলতার জিনগুলি পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে সঞ্চারিত হচ্ছে। এই গবেষণায় দ্রুত বিবর্তিত হওয়া জিনোমের অঞ্চলগুলি এমন জিনের আশেপাশে পাওয়া গেছে যা স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মধ্যে ক্যান্সার প্রতিরোধ বা টিউমার-বিরোধী প্রতিরোধ ক্ষমতায় ভূমিকা রাখে।
যদিও এই নেকড়েরা এখনও ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছে, তবে এই স্থিতিস্থাপক প্রাণীরা তুলনামূলকভাবে কম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, যা তাদের প্রতিরোধী জিনগুলিকে বংশ পরম্পরায় এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করছে। এই গবেষণা শুধুমাত্র বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞানকে প্রভাবিত করছে না, বরং মানব রোগের চিকিৎসাকেও প্রভাবিত করতে পারে, কারণ বিজ্ঞানীরা এই নির্দিষ্ট জিনগত পরিবর্তনগুলির সম্ভাব্য নিরাময়মূলক ব্যবহার নিয়ে কাজ করছেন। চেরনোবিল বর্জন অঞ্চল, যা ইউক্রেনের কিয়েভ ওব্লাস্টে অবস্থিত এবং বেলারুশের পোলিসি স্টেট রেডিওইকোলজিক্যাল রিজার্ভের সাথে সংযুক্ত, তা নেকড়েদের পাশাপাশি ইউরেশীয় বাইসন এবং প্রজেওয়ালস্কির ঘোড়ার মতো অন্যান্য বিপন্ন প্রজাতির জন্যও একটি অভয়ারণ্য হিসেবে কাজ করছে। এই অঞ্চলটি ১৯৮৬ সালের পারমাণবিক দুর্ঘটনার পর প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং এর আয়তন প্রায় ২,৬০০ বর্গ কিলোমিটার। এই বন্যপ্রাণী অধ্যয়নের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা পরিবেশগত চাপ এবং তেজস্ক্রিয়তার অধীনে জীবনের অভিযোজন সম্পর্কে গভীর ধারণা লাভ করছেন, যা পরিবেশগত রেডিওবায়োলজিক্যাল গবেষণার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।




