
জীবনব্যাপী শিক্ষার প্রতীক কার্ত্যায়নী আম্মার প্রয়াণ ও তাঁর উত্তরাধিকার
সম্পাদনা করেছেন: Olga Samsonova

কেরালার শিক্ষাক্ষেত্রে এক উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক, কার্ত্যায়নী আম্মা, যিনি ৯৬ বছর বয়সে সাক্ষরতা পরীক্ষায় জাতীয় স্তরে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন, তিনি ১০১ বছর বয়সে প্রয়াত হয়েছেন। তাঁর জীবন সংগ্রাম এবং শিক্ষার প্রতি অবিচল নিষ্ঠা বিশ্বজুড়ে অসংখ্য মানুষের কাছে এক জীবন্ত অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে। কেরল রাজ্য সাক্ষরতা মিশনের (Kerala State Literacy Mission) অধীনে ২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত 'অক্ষরলক্ষ্ম' কর্মসূচিতে তিনি সর্বোচ্চ নম্বর পেয়েছিলেন, যা প্রমাণ করে যে জ্ঞানের অন্বেষণে বয়সের কোনো বাধা নেই।
আম্মার এই অসাধারণ সাফল্য এসেছিল কেরল রাজ্য সাক্ষরতা মিশনের 'অক্ষরলক্ষ্ম' কর্মসূচিতে, যেখানে তিনি ৪৩,৩৩০ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করেন এবং ১০০-এর মধ্যে ৯৮ নম্বর পান। এই পরীক্ষায় পঠন, লিখন এবং গণিত—এই তিনটি মূল বিষয়ে তাঁর দক্ষতা যাচাই করা হয়েছিল, যেখানে পঠন ও গণিতে তিনি পূর্ণ ৩০-এর মধ্যে ৩০ পেয়েছিলেন। তাঁর এই কৃতিত্ব কেবল ব্যক্তিগত বিজয় ছিল না, এটি ছিল কেরালার শতভাগ সাক্ষরতার লক্ষ্য অর্জনের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
কার্ত্যায়নী আম্মার শিক্ষার প্রতি আগ্রহ জাগে যখন তিনি তাঁর ৬০ বছর বয়সী কন্যাকে একটি সাক্ষরতা কোর্স সম্পন্ন করতে দেখেন। শৈশবে দারিদ্র্যের কারণে পড়াশোনা ছেড়ে দিতে বাধ্য হওয়া আম্মা, পরবর্তী জীবনে গৃহকর্মী এবং মন্দিরের পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করে ছয়টি সন্তানের ভরণপোষণ করেছেন। তাঁর এই প্রত্যাবর্তন কেবল ব্যক্তিগত জেদেই সম্ভব হয়নি, বরং এর পিছনে ছিল পারিবারিক সমর্থন; বিশেষত তাঁর প্রপৌত্র-প্রপৌত্রীরা তাঁকে পঠন ও লিখন শিক্ষায় সহায়তা করেছিলেন।
তাঁর এই অদম্য ইচ্ছাশক্তি এবং অধ্যবসায়ের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ভারত সরকারের সর্বোচ্চ নারী সম্মাননা, 'নারী শক্তি পুরস্কার'-এ ভূষিত হন, যা তিনি ২০২০ সালে রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দের কাছ থেকে গ্রহণ করেন। আম্মার এই অনুপ্রেরণামূলক যাত্রা বিশ্ব মঞ্চেও সমাদৃত হয়েছিল; তিনি ২০১৯ সালে কমনওয়েলথ অফ লার্নিং গুডউইল অ্যাম্বাসেডর (Commonwealth of Learning Goodwill Ambassador) হিসেবে নিযুক্ত হন। কেরালার মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন তাঁর প্রয়াণে গভীর শোক প্রকাশ করে তাঁকে 'কেরালার গর্ব' হিসেবে অভিহিত করেছেন এবং বলেছেন যে তাঁর মৃত্যু রাজ্যের সাক্ষরতা আন্দোলনের জন্য এক বিশাল ক্ষতি।
তাঁর জীবনযাত্রা দেখায় যে প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা কীভাবে যেকোনো বয়সে শিক্ষার সুযোগ এনে দিতে পারে, যা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। তাঁর এই অসামান্য জীবনকাহিনী আন্তর্জাতিক স্তরেও প্রশংসিত হয়েছে; প্রখ্যাত শেফ বিকাশ খান্না তাঁর জীবন ও মানসিকতা নিয়ে 'বেয়ারফুট এমপ্রেস' (Barefoot Empress) নামে একটি তথ্যচিত্র নির্মাণ করেন, যা তাঁর দৃঢ় সংকল্পের চিত্র তুলে ধরে। কেরালার সাক্ষরতা মিশনের পরিচালক পি.এস. শ্রীকলার মতে, আম্মা রাজ্যের সাক্ষরতা অভিযানের 'পোস্টার গার্ল' হয়ে উঠেছিলেন, যা সমাজের প্রান্তিক অংশ, যেমন মৎস্যজীবী এবং উপজাতি গোষ্ঠীভুক্ত হাজার হাজার মানুষকে শিক্ষায় ফিরিয়ে আনতে অনুপ্রাণিত করেছে।
কার্ত্যায়নী আম্মার উত্তরাধিকার কেবল সাক্ষরতার গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়; তিনি প্রমাণ করেছেন যে প্রতিকূলতা এবং সামাজিক বাধা অতিক্রম করে শেখার আনন্দ জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত উপভোগ করা সম্ভব। তাঁর এই যাত্রা প্রমাণ করে যে, শিক্ষার অধিকার পুনরুদ্ধার এবং ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্য সাহস ও অধ্যবসায় অপরিহার্য, এবং কেরল রাজ্য সাক্ষরতা মিশনের মতো প্রতিষ্ঠানের সমর্থন এই ধরনের রূপান্তরমূলক পরিবর্তনে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
5 দৃশ্য
উৎসসমূহ
The Logical Indian
Wikipedia
Hindustan Times
The Hindu
Manorama Yearbook
Deccan Herald
এই বিষয়ে আরও খবর পড়ুন:
আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।



